• ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের কাছে ‘SIR’ প্রশ্নই হাতিয়ার তৃণমূল প্রার্থীর
    এই সময় | ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, সপ্তগ্রাম

    বৈশাখের প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই সম্প্রতি সকাল ১০টা নাগাদ সপ্তগ্রাম কলোনিতে তৃণমূল প্রার্থী বিদেশ বসুর পথ চেয়ে ধর্মগুরু সচ্চিদানন্দ গোস্বামীর ভিটে সেবাকুঞ্জয় অপেক্ষা করছিলেন মৌসুমি দাস, কানাইলাল দত্ত, শুক্লা দাস, মমতা পাল ও প্রিয়াঙ্কা কর্মকার। সেখানে দাঁড়িয়েই ভোটের বাজারে পুরোনো স্মৃতি আউরে আড্ডার মেজাজে লোকজন আলোচনা করছিলেন, কী ভাবে দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে পূর্বপুরুষরা এখানে এসে দশ মাথা একজোট হয়ে প্রাণপণ সংগ্রাম করে কলোনিতে মাথা গোঁজার আস্তানা করেছিলেন। এখন বিধানসভা ভোটের আবহে 'সার'-এর নাম করে বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায়, নতুন করে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে কি না, সেই নিয়েই আলোচনা চলছিল।

    মৌসুমী, শুক্লার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রিয়াঙ্কাও গলা মিলিয়ে একসুরে বলে ওঠেন, 'এই গ্রামেই জন্মকর্ম, তার পরেও ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়েছে যাঁদের, তাঁদের কী হবে?' পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কানাইলাল বলে বসলেন, 'কেন, বৈধ ভোটাররা যাতে ভোট দিতে পারেন, সেই বিষয়ে শীর্ষ আদালত কিছু একটা রায় দিয়েছে।' সঙ্গে সঙ্গে পাশের এক গৃহবধূর সংযোজন, 'বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে আদালতে লড়াই করেছেন, সেটা কিন্তু মনে রাখার মতো।' এই সব আলোচনার মধ্যেই শঙ্খনগর, বারুজীবী কলোনি ও নমাজগড় ঘুরে সপ্তগ্রাম কলোনিতে এসে হাজির হন এখানকার তৃণমূল প্রার্থী, জাতীয় প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসু।

    দলের নেতা, কর্মী-সমর্থকরাও তখন পিলপিল করে সেবাকুঞ্জের সামনে ভিড় জমিয়েছেন। সেখানে অপেক্ষারত মানুষের আলোচনা শুনে প্রার্থী বিদেশ বসু বললেন, 'দেখলেন, গ্রামের মানুষরা ঠিক মনে রেখেছেন, একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী তথা আমাদের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি ছুটে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। বুঝলেন, এটাই হলো 'মমতা ম্যাজিক।' অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের শাসক, বিরোধী যিনিই হোন না কেন, মানুষের অধিকার রক্ষায় অতীতে বা সাম্প্রতিক কালে এমন লড়াই দিয়েছেন বলে মনে পড়ছে না। চায়ের দোকান থেকে মানুষের বাড়ি যেখানেই প্রচারের জন্য মানুষের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি, সেখানেই নেত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। বিরোধীদের কুৎসা সত্ত্বেও মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন বলে আমার বিশ্বাস।'

    সপ্তগ্রাম কলোনির বাসিন্দারা জানান, দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এ দেশে এসে, উচ্চ শিক্ষিত সচ্চিদানন্দ গোস্বামী, হরেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রফুল্ল দাস, রাখাল দাস, বসন্ত গঙ্গোপাধ্যায়, বিভূতি সরকার, রেবতী পাল ও বিনয়ভূষণ দত্ত- মোট ১০জন সপ্তগ্রাম কলোনি তৈরির মূল কাণ্ডারি হয়ে দাঁড়ান। এ দেশে এসে প্রতিকূল অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সঙ্কটে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা তখন কলোনিবাসীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ওই সময়ে সপ্তগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজসেবী, যিনি প্রায় ভগবানের মতো আবির্ভূত হন, তিনি হলেন সুরেন্দ্রনাথ পাত্র।

    কলোনির ধর্মগুরু সচ্চিদানন্দ গোস্বামী, প্রফুল্ল, রাখাল, সতীশ, সুরেন্দ্রর মতো সবাইকে নিয়ে আলোচনা করে, শিবমন্দির, বাজার ও স্কুল করার জন্য জমি দেন তিনি। সচ্চিদানন্দ বুঝেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের উন্নতি অসম্ভব। সপ্তগ্রাম কলোনির বাসিন্দারা একসঙ্গে রান্না করে খাওয়াদাওয়া করতেন। সবাই এক অন্ন, ডাল, সবজি খেতেন। রাতে মহিলাদের সুরক্ষার জন্য পাহারা দিতেন সচ্চিদানন্দ, প্রফুল্ল, রাখালরা। সচ্চিদানন্দ বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত হয়ে রাধাকৃষ্ণের মন্দির স্থাপন করেন। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সচ্চিদানন্দের শিষ্যরা তাঁর ভিটে সেবাকুঞ্জয় রাধাকৃষ্ণের সেবা করে চলেছেন।

    কলোনির বাসিন্দা কানাইলাল দত্ত বলেন, 'এক এ দেশীয় (ঘটি) ব্যবসায়ী হয়ে, একঝাঁক বাঙালকে উজাড় করে সব কিছু দিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ পাত্র, যা বাংলার ইতিহাসে বিরল। পরে কলোনির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন সদ্য প্রয়াত আইনজীবী না 'নিজের লোক' ছিলেন। পুরোনো ঐতিহ্য স্মরণ করেই একজোট হয়ে এ দিন সেবাকুঞ্জে দুপুরে প্রসাদ খান সবাই। সেখানে বিদেশ বসুও ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি কোনও বিত্তশালী পরিবার থেকে আসিনি। আমিও আপনাদের মতো দরিদ্র পরিবার থেকেই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছি। আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চাই।' সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা সমস্বরে 'জয় বাংলা' বলে স্লোগান দিয়ে ওঠেন।

  • Link to this news (এই সময়)