বুদ্ধদেব বেরা
এই মুহূর্তে তিনি রাজনীতির ঝালে। ঝোলে বা অম্বলে নন। কারণ তাঁকে, থুড়ি, তাঁর দোকানের ঝালমুড়ি এখন বীর ‘বিক্রম’-এ রাজ করছে ঝাড়গ্রামের (পড়ুন পশ্চিমবঙ্গের) আলোচনায়। তাঁর হাতে তৈরি ঝালমুড়ি কিনে খাওয়ার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘নাটক’ করে পকেট থেকে ১০ টাকা বের করেছেন বলে অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
ভোট এমন ‘বড় বালাই’ যে, যিনি কোনও দিন ঝালমুড়ি কিনেই খান না, তিনিও প্রধানমন্ত্রীর সারপ্রাইজ় ভিজ়িটের পরে মুড়ি কেনার ছলে তাঁর দোকানে এসে টুক করে পেড়ে ফেলেছেন মোদী-প্রসঙ্গ। দেঁতো হাসি হেসে পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে খচাৎ করে তুলে ফেলেছেন সেলফিও—ঝাড়গ্রামের ‘মিনি ইনফ্লুয়েন্সর’-এর সঙ্গে ‘চল বেটা সেলফি লে লে রে’ মোমেন্ট। রবিবার সন্ধের পর থেকে জনগণের প্রশ্নের উত্তর, আর ফটো সেশন-পর্বের সঙ্গে তালে তাল মেলাতে মেলাতে তিনি খানিকটা ক্লান্ত। নইলে কি ‘ফেমাস’ হয়ে ওঠার রেশ কাটার আগেই মোবাইল ফোনটা বন্ধ করে দিতে হয় বিক্রমকুমার সাউকে?
দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছেন। তাঁকে আর পায় কে! সোমবার সকাল থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখতে হয়েছে তাঁকে। রবিবার কী ঘটেছিল, তা শুনতে, যে যেখান থেকে পারছেন, ফোন করছেন বিক্রমকে। টিভি, খবরের কাগজ, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে ভ্লগার, ফোন খুললেই অনবরত বেজে চলেছে রিংটোন— ফোনের ঠেলায় খদ্দের সামাল দিতে পারছেন না তিনি। ব্যবসায়ী মানুষ বলে কথা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাড়ে হাড়ে বুঝে গিয়েছেন: ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ কাকে বলে। যদিও রাতারাতি আয়ও বেড়েছে বিক্রমের।
রবিবার ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামে জনসভা ছিল নরেন্দ্র মোদীর। সেই সভা শেষ করে হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে যাওয়ার সময়ে পথে কলেজ মোড়ে গাড়ি থামিয়ে বিক্রমের দোকান থেকে ঝালমুড়ি খান মোদী। ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবার ছেলে বিক্রমের দোকানের ঝালমুড়ি তখন থেকেই ভাইরাল। স্মার্টফোনের সৌজন্যে এমন চাপ যে, শেষমেশ ফোনটাই বন্ধ করে রাখতে হলো বিক্রমকে।
রবিবার মোদী ১০ টাকার মাখামুড়ি কিনেছিলেন বিক্রমের দোকান থেকে। যাকে কেন্দ্র করে এ দিন বীরভূমের মুরারইতে খান ক্রিকেট গ্রাউন্ডে জেলার দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে ভোট প্রচার করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘১০ টাকা কখনও পকেটে থাকে ওঁর? কত নাটক। নির্বাচনের সময়ে গুহাতে গিয়ে বসে থাকেন। কখনও নির্বাচনের সময় বলেন আমি চাওয়ালা। ১০ টাকা বের করে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। সেটাও নিজেদের তৈরি করা। নয়তো দোকানে ক্যামেরা ফিট করা ছিল কী ভাবে?’
যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী চলে যেতে না যেতেই রবিবার সন্ধের পর থেকে বিক্রমের দোকানে মুড়ি খাওয়ার লম্বা লাইন। দোকানের সাইনবোর্ডে থাকা তাঁর মোবাইল নম্বরও মুহূর্তে ভাইরাল। বিক্রম বলেন, ‘মোদীজি ঝালমুড়ি খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই দোকানে যেমন মানুষের ভিড় হচ্ছে, ঠিক তেমন ফোনও আসছে প্রচুর। রবিবার সন্ধের মুখে এত ফোন আসছিল যে, বাধ্য হয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছিলাম। মোবাইল খুললেই কল আসছে। একের পর এক সেই একই প্রশ্ন: ‘মোদীজি কী বললেন?’, ‘কেমন দেখলেন প্রধানমন্ত্রীকে?’, ‘কী বলল তোমাকে?’, ‘মুড়িতে কী কী খেলেন তিনি?’। দোকানে ঝাল মুড়ি নিতে আসছেন লোকজন। সেই একই প্রশ্ন। দু’দিক সামাল দিতে না পেরে ফোনটাই বন্ধ করে দিয়েছি।’
যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী চলে যেতে না যেতেই রবিবার সন্ধের পর থেকে বিক্রমের দোকানে মুড়ি খাওয়ার লম্বা লাইন। দোকানের সাইনবোর্ডে থাকা তাঁর মোবাইল নম্বরও মুহূর্তে ভাইরাল। বিক্রম বলেন, ‘মোদীজি ঝালমুড়ি খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই দোকানে যেমন মানুষের ভিড় হচ্ছে, ঠিক তেমন ফোনও আসছে প্রচুর। রবিবার সন্ধের মুখে এত ফোন আসছিল যে, বাধ্য হয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছিলাম। মোবাইল খুললেই কল আসছে। একের পর এক সেই একই প্রশ্ন: ‘মোদীজি কী বললেন?’, ‘কেমন দেখলেন প্রধানমন্ত্রীকে?’, ‘কী বলল তোমাকে?’, ‘মুড়িতে কী কী খেলেন তিনি?’। দোকানে ঝাল মুড়ি নিতে আসছেন লোকজন। সেই একই প্রশ্ন। দু’দিক সামাল দিতে না পেরে ফোনটাই বন্ধ করে দিয়েছি।’
বিক্রম বিহারের গোয়ার বাসিন্দা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবায় থাকেন। তাঁর পরিবারে আছেন বাবা-মা, তিন বোন, স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের ছেলে। বিক্রম জানিয়েছেন, দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার ব্যবসা হয় তাঁর দোকানে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে ঝালমুড়ি খাওয়ার পরে রাতারাতি সে বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিক্রম এখন সেলেব্রিটি হয়ে গিয়েছেন। লোকজন এসে কুশল বিনিময়ও করে যাচ্ছেন।
বিক্রমের দোকানের গা ঘেঁষেই মাংসের দোকান। এমন অবস্থা, বিক্রমকে না পেয়ে পাবলিক ফোন করে ফেলছে ওই ব্যবসায়ীকেও। তিনি বলেন, ‘বিক্রমের দোকানের পাশেই আমার দোকান। সাইনবোর্ডে মোবাইল নম্বর রয়েছে। তাঁর দোকানের সঙ্গে আমার দোকানের ছবিও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখান থেকেই ফোন নম্বর পেয়ে লোকজন আমাকেও ফোন করছেন। এমন অবস্থা যে, দোকানই চালাতে পারছি না।’
রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিক্রম জানতে চেয়েছিলেন, পেঁয়াজ দেবেন কি না মুড়িতে। শুনে মোদীর সরস জবাব ছিল, ‘হ্যাঁ পেঁয়াজ খাই। দিমাগ নেহি খাতে হ্যায়, বস (মাথা খাই না শুধু)।’
প্রধানমন্ত্রী দোকানে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খেয়ে গিয়েছেন বলে কথা, সেই খ্যাতির বিড়ম্বনা পোহাতে গেলে জনগণ যে ‘দিমাগ’ একটু খাবেই। রাজনীতির লড়াই হোক অথবা সেলিব্রিটির সঙ্গে এক লহমার সেলফি—জনতাই তো জনার্দন।