একসময় ছিল ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’। কৃষক খেত মজুরদের অধিকার ছিনিয়ে আনার রক্তিম বিপ্লবের প্রতীক। সেখানেই এখন ফিকে লাল। গেরুয়া ঝড়ে বিস্মৃত সেদিনের স্বপ্নগাঁথা! প্রায় এক দশক ধরেই এলাকা ধীরে ধীরে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের। এবারও এলাকায় জোর প্রচার চলছে বিজেপির। গ্রামের জায়গায় জায়গায় বিজেপির পতাকা দেখা যাচ্ছে। প্রচারে উঠছে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি।
পুলিশ ইন্সপেক্টর সোনাম ওয়াংদির কথা মনে পড়ে! নতুন প্রজন্ম না জানলেও নকশালবাড়ির প্রবীণরা স্মৃতির পথ হাতড়ে ঠিক বলে দেন সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে কেমন করে প্রতিরোধের মুখে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি। পরদিন বিরাট পুলিশবাহিনী এলাকায় ঢুকে ২ শিশু-সহ ১৩ জনকে হত্যা করে বলে অভিযোগ। মৃতেরা অধিকাংশ ছিলেন মহিলা। এরপরই বিদ্রোহের বহ্নিশিখা দাবানলে পরিণত হয়। সেটি ১৯৬৭ সালের মে মাসে নকশালবাড়ির প্রসাদজোতের ঘটনা। কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ভিন্ন ধারার ওই সশস্ত্র আন্দোলন পরবর্তীতে রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে নকশালবাড়ি অথবা নকশাল আন্দোলন নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। চিনের কম্যুনিস্ট পার্টি তরাইয়ের ওই কৃষক বিদ্রোহকে ‘ভারতের বুকে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ বলে প্রচার করে। ১৯৬৭ সালের মে মাসের ঘটনার দু’বছর পর ১৯৬৯ সালে সিপিআই (এমএল) গঠিত হয়।
যে হাতিঘিসা ছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানেই সেবদাল্লাজোত গ্রামের একটি মাটির বাড়িতে থাকতেন আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা কানু সান্যাল। সেই দিক থেকে অনেকেই নকশালবাড়ি ও হাতিঘিসাকে কানু সান্যালের গড় বলে থাকেন। কিন্তু ওই গড় কতটা অক্ষত, অটুট আছে? বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) জোড়াফুল ও পদ্মফুলের কড়া টক্কর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিপিএম প্রার্থী দিলেও খুব একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ। এখন ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ অথবা ‘বন্দুকের নলই রাজনীতির উৎস’ এমন স্লোগান নকশালবাড়ির দেওয়ালে লেখার কেউ নেই। গত বিধানসভা নির্বাচন থেকে আসনটি কট্টর নকশাল বিরোধী বিজেপির দখলে। দার্জিলিং লোকসভা আসনের অধীন নকশালবাড়ি। সেটাও বিজেপির দখলে। রাজনৈতিক মহল বলছে, কানু সান্যালের গড়ে মহীরুহ হয়ে উঠেছে গেরুয়া শিবির। গোটা এলাকায় বিজেপির পতাকা, ফেস্টুন জ্বলজ্বল করছে। তৃণমূলের পতাকাও আছে, তবে সংখ্যায় অনেক কম।
বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মনের দাবি, এলাকার সার্বিক উন্নয়নের আশায় সাধারণ মানুষ চরমপন্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে একসময় যে এলাকা ছিল লাল দুর্গের প্রতীক, সেটিই এখন বিজেপির সমর্থনে সরব। এবারও বড় জয় আসবে বলে জোর গলায় তিনি জানিয়েছেন। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সভাধিপতি অরুণ ঘোষ অবশ্য বিজেপির যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁর পালটা দাবি, “বিজেপি মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে গতবার ভোটে জিতেছে। এবার সেটা হচ্ছে না। কারণ, ওরা কাজ করেনি। এলাকার মানুষ তাই তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছে।”
অতীতের উগ্র বামপন্থা পরবর্তীতে বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। ২০১৪ সালে বিজেপি সাংসদ এসএস অহলুওয়ালিয়া হাতিঘিসা গ্রাম পঞ্চায়েত দত্তক নিয়েছিলেন। সেই সময় থেকে এখানে গেরুয়া শিবিরের প্রভাব বেড়েছে। যদিও এলাকার উন্নয়নে তিনি কোনও কাজ করেননি বলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। যদিও প্রায় গোটা উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি এই এলাকাতেও বিজেপি ভোটের নিরিখে জয় পেতে থাকে। যদিও রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলও এলাকায় জনসংযোগ চালায় বিভিন্ন সময়। রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে তৃণমূল পরিচালিত শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ কানু সান্যালের স্মরণে লাইব্রেরি ও পর্যটন কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেয়।
ক্রমশ সমীকরণ পালটে যেতে ‘জমি যার, লাঙল তার’ স্লোগান ফিকে হয়েছে। নকশাল আন্দোলনের প্রসুতিগার হাতিঘিসায় এখন আর সেভাবে লাল পতাকা দেখা যায় না। কানু সান্যালের বাড়ির সামনে দলের পতাকা দেখা গেলেও এলাকার অলিগলি দখলে নিয়েছে গেরুয়া পতাকা। যে বিপ্লবের স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সেখানেই এখন ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা যায়। এবার ভোটে কী করবে নকশালবাড়ি?