সমস্যার পাহাড় শিবপুরে, ‘সাতে-পাঁচে’ না থাকা রুদ্রনীল নাকি তৃণমূলের রানা, এগিয়ে কে?
প্রতিদিন | ২১ এপ্রিল ২০২৬
হাওড়া বললেই মনে পড়ে যায় বোটানিক্যাল গার্ডেন, বিই কলেজ (এখন নাম বদলে আইআইইএসটি)। আর এই জেলার নির্বাচনী মানচিত্রে অন্যতম ‘হটস্পট’ কেন্দ্র শিবপুর।বাম জমানায় শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বারবারই ক্ষমতা বদল হয়েছে। সিপিএম নয়, ‘সিংহবাহিনী’ অর্থাৎ ফরওয়ার্ড ব্লকের হাত থেকে বহুবার এই কেন্দ্র ছিনিয়ে নিয়েছে কংগ্রেস। প্রায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভিন্ন ভিন্ন বিধায়ক পেয়েছেন শিবপুরবাসী। ছাব্বিশেও সম্ভবত নতুন জনপ্রতিনিধি পাবেন তাঁরা। তবে এবার রাজনৈতিক দলমত, আদর্শকে সামনে রেখে যত না ভোট (Bengal Election 2026) দেবেন বাসিন্দারা, তার চেয়ে ঢের বেশি নজর তাঁদের পুর পরিষেবা পাওয়ায়। গত বেশ কয়েকবছর ধরে এখানকার নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত তাঁরা। কারণ একটাই, হাওড়া পুরনিগমের ভোট না হওয়া, বোর্ড তৈরি না হওয়া। হটস্পট শিবপুর ঘুরে অন্তত তেমনই বোঝা যাচ্ছে। তৃণমূল-বিজেপি-বাম-কংগ্রেসের চতুর্ভুজ লড়াই তাই এখানে বেশ কঠিন নিঃসন্দেহে।
কোন অঙ্কে এবার শিবপুরের ভোটযুদ্ধ ভিন্ন হতে চলেছে, তা বোঝার আগে এই কেন্দ্রের খুঁটিনাটি তথ্য একটু জেনে নেওয়া যাক। শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৯৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯৬ হাজার ১৯৩ জন। মহিলা ভোটার ৯৮ হাজার ৭৬৩ জন। সংখ্যালঘু মুসলিম জনতার হার ১০ শতাংশ, তপসিলি জাতি ও উপজাতি ১০ শতাংশেরও কম। এসআইআরের প্রভাবে প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এই প্রভাব ভোটবাক্সে কিছুটা প্রতিফলিত হবে ঠিকই, কিন্তু এনিয়ে স্থানীয়দের তেমন মাথাব্যথা নেই। তাঁদের এখন বেশি প্রয়োজন নিকাশি নালা পরিষ্কার, পানীয় জলের অভাব পূরণের মতো জীবনযাপনের প্রাথমিক শর্তগুলো পূরণ।
নিকাশি নালা বা ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বহু ওয়ার্ডে সারাবছর জল জমে থাকে। এছাড়াও রয়েছে পানীয় জলের অভাব। কোনও দমকল কেন্দ্র নেই এখানে। এই সবই ছাব্বিশের ভোটে এখানকার প্রধান ইস্যু। এছাড়া জলাজমি ভরাট করে বেআইনি নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে হাওড়া পুরসভায় কোনও বোর্ড নেই। আইনি জটে এখানে ভোটও হয়নি। সমস্যা সমাধানে রাজ্য বিধানসভায় বিল পাশ হলেও রাজ্যপাল সই না করায় তা ঠান্ডা ঘরে পড়ে। আপাতত কোনও কাউন্সিলর নেই এখানকার ওয়ার্ডগুলিতে, পুর প্রশাসক দায়িত্বে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনও কাজ হয়নি। শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ওয়ার্ডগুলিতে নিকাশি সমস্যার সমাধানে বড় কোনও কাজ হয়নি। এ প্রসঙ্গে বলে নেওয়া দরকার, হাওড়া পুরনিগমের মোট ১০ টি ওয়ার্ড এই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত।
শিবপুরের মাটিতে বিজেপির তারকা প্রার্থী অভিনেতা থেকে পুরোদস্তুর নেতা হয়ে ওঠা রুদ্রনীল ঘোষ। শাসকদলের হয়ে ভোটে লড়ছেন চিকিৎসক প্রার্থী এবং অন্য কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক রানা চট্টোপাধ্যায়। বামেরা এই আসন পুরনো জোটসঙ্গী ফরওয়ার্ড ব্লককে ছেড়েছে। ‘সিংহ’ প্রতীকে লড়ছেন এখানকার প্রাক্তন বিধায়ক ডাঃ জগন্নাথ ভট্টাচার্য ও কংগ্রেস প্রার্থী শ্রাবন্তী সিং। পাল্লা ভারী কার দিকে? শিবপুরবাসীর জনমত কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন। তাঁদের কথা শুনে সরলরৈখিক পথে কোনও অঙ্কের উত্তর কিন্তু মিলবে না। কেউ কেউ বলছেন, এবার বিজেপির পাল্লা ভারী। সম্পূর্ণ উলটোপথে হেঁটে কারও আবার মন্তব্য, খোদ মোদি এসে দাঁড়ালেও এখানে জিততে পারবে না। তবে একটি বিষয়ে সবার এক সুর – পরিষেবা চাই। যে দলই দিতে পারবে, তাদেরই জয়ী করবেন আমজনতা। প্রশ্ন হল, কে এতদিনকার জঞ্জাল সাফ করবে? কে-ই বা অসম্পূর্ণ কাজকর্ম শেষ করবে?
এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী চিকিৎসক রানা চট্টোপাধ্যায় প্রচারে বলছেন, বিধায়ক হলে তিনি এই কেন্দ্রে সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করবেন। বেলগাছিয়ার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতালে পরিণত হবে। ছানিমুক্ত শিবপুর করবেন অর্থাৎ ছানির অস্ত্রপচার হবে বিনামূল্যে। একটি দমকল কেন্দ্র গড়ে তুলবেন ও শিবপুরের মূল নিকাশি নালার সংস্কার ও পানীয় জলের অভাব দূর করবেন। নিকাশির ঠিকমতো সংস্কার না হওয়াতে এখানে অনেক এলাকাতেই জল জমে থাকে। সেই সমস্যার সমাধান করতে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হবে। তবে শিবপুরে রানা চট্টোপাধ্যায়ের পরীক্ষা কিছুটা কঠিন। এই কেন্দ্রে এবার তৃণমূল বিধায়ক তথা রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারিকে এবার টিকিট দেয়নি দল। মনোজ তিওয়ারির ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের একাংশ চিকিৎসক রানার হয়ে বিধানসভা নির্বাচনে লড়বেন কি না সেই প্রশ্ন রয়েছে। তবে তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের দাবি, দলের ভিতর কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই। রানা চট্টোপাধ্যায়কে জেতাতে সবাই একসঙ্গে লড়াই করছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে শিবপুর কেন্দ্রে ১৪,৫০০ ভোটে এগিয়েছিল তৃণমূল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিল ৩২০০০ ভোটে। ফলে শাসকদলের জমি বেশ শক্ত।
শিবপুর থেকে এবার পদ্মশিবিরের প্রার্থী ‘পাড়ার ছেলে’ অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। প্রচারে তিনি আত্মবিশ্বাসী যে পাড়ার কাকিমা, জেঠিমারা তাঁকেই সমর্থন করবেন। রুদ্রনীলের বক্তব্য, ‘‘বিধায়ক হয়ে এলে প্রথম নিকাশি সমস্যার সমাধান করব। একইসঙ্গে পানীয় জলের অভাব যাতে মেটে তা দেখব। পাশাপাশি জলাজমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণও বন্ধ করব।’’ বিগত দিনে ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লড়ে হেরে যাওয়া রুদ্রনীল শিবপুর জয়ের ব্যাপারে যতই আত্মবিশ্বাসী হোন না কেন, বিতর্ক তাঁকে নিয়েও তো কম নেই। তাঁর ঘনঘন দলবদল, সাতে-পাঁচে না থাকা ভিডিওর কথা কেউ ভুলতে পারেননি এখনও। এবার আবার প্রচারে বেরিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তোলা তৃণমূল কর্মীকে জড়িয়ে চুমু খাওয়ার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ নিয়ে যথেষ্ট সমালোচিত রুদ্রনীল। তাঁকে কতটা সমর্থন করছেন পাড়ার লোকজন? জগাছা এলাকার এক মহিলার কথায়, ”ও (রুদ্রনীল) আমাদের পাড়ার ছেলে ঠিকই, তবে দেখতে তো পাই না। এখন ভোটের সময় প্রচার করতে আসছে। ভোট হয়ে গেলে আবার উধাও হয়ে যাবে হয়তো। তাছাড়া এই যে এখানে জলের সমস্যার যে সমাধান হয়ে গেল, এই যে রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে , সব তো তৃণমূল সরকারের আমলেই হচ্ছে।”
ঘাসফুল-পদ্মফুলের লড়াইয়ের মাঝে নিজের ছন্দে প্রচার করে চলেছেন শিবপুর কেন্দ্রের বাম সমর্থিত ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী জগন্নাথ ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, ‘‘শিবপুরের বাসিন্দারা আবার একবার স্টিয়ারিংটা বামদিকে ঘুরিয়ে দেখুন না উন্নয়ন হয় কি না? আমি বিধায়ক হলে শিবপুরের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাব।’’ ২০০৬ সালে শিবপুর কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন জগন্নাথ ভট্টাচার্য। কংগ্রেস প্রার্থী শ্রাবন্তী সিং বললেন, ‘‘হাওড়া পুরসভায় বোর্ড না থাকার জন্য দীর্ঘদিন হাওড়ার বাসিন্দারা সমস্তরকম নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রও তার ব্যতিক্রম নয়। বিধায়ক হলে নাগরিকদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য যা করার দরকার সবই আমি করব।’’ যদিও এলাকায় কংগ্রেসের তেমন সংগঠন নেই, তাই শ্রাবন্তীকে তেমন ভরসা করছেন না কেউ। আগামী ২৯ এপ্রিল এখানে ভোট। এবার শিবপুরের দখল রাখবে কে, তা বোঝা যাবে ৪ মে।