• গ্রেপ্তারির আশঙ্কা, মামলা হাইকোর্টে, ১৫০ ঘণ্টায় কী অপারেশন! প্রশ্ন তৃণমূলের
    এই সময় | ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: ‘মধ্যরাতের অপারেশন’–এর রেশ এ বার আদালতের দোরগোড়ায়!

    বঙ্গে ভোটযুদ্ধের উত্তপ্ত আঁচের মধ্যে এক সপ্তাহ আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম অভিযোগ করেছিলেন, ‘মধ্যরাতে অপারেশন’ চালিয়ে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতা–কর্মী–এজেন্টদের গ্রেপ্তার করতে পারে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। তার জন্য দলীয় প্রার্থীদের বিকল্প এজেন্ট তৈরি রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। গত ক’দিনে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা এই অভিযোগ তুলে আক্রমণ শাণাচ্ছেন কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার, কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং দেশের নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এ বার তৃণমূলকে চাপে ফেলতে ভোটের মুখে প্রার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুরসভা–পঞ্চায়েত প্রতিনিধিকেও বিভিন্ন অজুহাতে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে মামলা দায়ের হলো কলকাতা হাইকোর্টে। তৃণমূলের সাংসদ, আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সোমবার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে জনস্বার্থ মামলা দায়েরের আর্জি জানান। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে। আগামিকাল, বুধবার মামলার শুনানি হতে পারে।

    ঘটনাচক্রে মমতা এ দিনও একাধিক সভা থেকে অভিযোগ করেছেন, বিজেপি তাঁদের দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা–কর্মীকে যেনতেন প্রকারে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করে গ্রেপ্তার করতে চাইছে। সরাসরি নিজের গ্রেপ্তারির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রী উদয়ন গুহ। এরপরে এ দিন সন্ধেয় সাংবাদিক বৈঠক করে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন‍ ও বিদায়ী মন্ত্রী শশী পাঁজা দাবি করেন, নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত তাঁদের কাছে খবর এসেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সিবিআই, ইডি এবং এনআইএ-এর মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির প্রধান ও শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বাংলার ভোট নিয়ে বৈঠক করেছেন। তৃণমূলের আশঙ্কা, আগামী ১৫০ ঘণ্টার মধ্যে বড় কিছু ঘটতে চলেছে। তবে কী ঘটতে চলেছে, তা খোলসা করেননি তাঁরা। যদিও এই সংক্রান্ত বিস্তারিত তাঁদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেছেন জোড়াফুল নেতৃত্ব।

    ঘটনা হলো, বাংলায় প্রথম দফায় ভোট রয়েছে ২৩ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল। তৃণমূলের ইঙ্গিত, প্রথম দফার ভোটের পরেই কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে নামিয়ে আরও বড় কোনও অপারেশনের ছক কষছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। যদিও তৃণমূলের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করুন। ওঁরা তো অনেক মামলা লড়েছেন। যদিও সাফল্যের হার খুব কম। কিন্তু এখনও তৃণমূল সিভিক ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার কথা বলছে। বিজেপির পোস্টার ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে।’

    দু’দফায় ভোটে ২৯৪টি বিধানসভা এলাকায় কে বা কারা অশান্তি ছড়াতে পারে, এমন প্রায় ৮০০ জনের নামের তালিকা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন এবং যে কোনও মুহূর্তে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে— এ দিন হাইকোর্টে এমনই দাবি করেছেন কল্যাণ। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলকে চাপে ফেলতে একেবারে ভোটের মুখে প্রার্থী থেকে দলের পদাধিকারী, এমনকী পঞ্চায়েত বা পুরসভার প্রতিনিধিকেও যে কোনও সময়ে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। মামলাকারীর দাবি, সেই তালিকায় শুধু তৃণমূলের প্রার্থী বা বাইরে থাকা নেতা নন, জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের নামও রয়েছে তালিকায়। আবার বিধাননগর কমিশনারেট এলাকায় ১৫৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। অভিযোগ, কোচবিহারের দিনহাটার তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ থেকে বেহালার রত্না চট্টোপাধ্যায়ও কমিশনের তালিকা অনুযায়ী ‘অশান্তি সৃষ্টিকারী’। ফলে যে কোনও সময়ে এঁদের যে কাউকেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে মামলায়।

    এ দিন বীরভূমের মুরারইয়ের সভায় মমতা বলেন, ‘ইলেকশনের আগে অনেককে গ্রেপ্তার করার পরিকল্পনা করেছে। লিস্ট আমি পেয়ে গিয়েছি। আবার কোর্টে যাব। প্রত্যেক কেসে আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়ব। ইলেকশন কমিশনের নামে যে লিস্ট বাজারে বেরিয়েছে, একটি সংবাদমাধ্যমের থ্রুতে আমি লিস্ট পেয়েছি। তৃণমূল কংগ্রেসকে টার্গেট করেছে। তৃণমূলের সব চোর আর বিজেপির সব সাধু?’ তাঁর অভিযোগ, ‘এই বীরভূমে বিজেপির এক নেতা লড়ছে, সে কোটি কোটি টাকা কয়লা থেকে খায়। আমি তার নাম জানি। ভদ্রতা করে বলছি না। তিন–চার বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি করেছে! সব চেয়ে বড় চোর বিজেপি, সব চেয়ে বড় ডাকাত বিজেপি।’ আবার কলকাতার বেলেঘাটার সভায় তাঁর অভিযোগ, ‘একজনের নাম হিমাংশুলাল। এটা আসল নাম নয়। ইচ্ছে করে বললাম না। তিনি বসে বসে সব অর্ডার দিচ্ছেন, তৃণমূলের সব কর্মীকে ভোটের আগে গ্রেপ্তার করতে হবে! আরও একজন অর্ডার দিচ্ছেন, যিনি সিঙ্গুরে জোর করে চাষিদের জমি দখল করেছিলেন।’ হুঁশিয়ারির সুরে তাঁর সংযোজন, ‘বিজেপির সংখ্যালঘু সরকার তো শিগগিরই যাবে! তারপরে যারা এই সব করছে, আমি তাদের ক্ষীরের নাড়ু পাঠাব। সবার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর জোগাড় করে রাখছি।’ উদয়নও অভিযোগ করেন, তিনি যাতে ভোটের দিন বাইরে না–বের হতে পারেন, সেজন্য কমিশনের নির্দেশে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

    বিকেলে আবার ডেরেক বলেন, ‘আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর রয়েছে যে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি সিবিআই, ইডি এবং এনআইএ প্রধানদের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করেছেন। আমাদের কাছে খবর আছে, বড় কিছু ঘটতে চলেছে। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে আগামী ১৫০ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে কোনও বড় ধরনের অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে বা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে।’ তাঁর কথায়, ‘কিছু একটা পাকছে। ফেয়ার অ্যান্ড ফ্রি শুধু সামনে বলছে, কিন্তু স্বাধীন ভাবে নির্বাচন হোক সেটা ওরা (ইসি) চাইছে না। আমাদের আশঙ্কা...মানে দেড়শো ঘণ্টা হিসেব করে নিন।’ তাঁর সংযোজন, ‘৫ ফুট ৪ ইঞ্চির একজন মহিলাকে হারাতে বিজেপি এতটাই মরিয়া যে, তারা ১৮ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং ২৪০০ প্ল্যাটুন কেন্দ্রীয় বাহিনী মাঠে নামিয়েছে।’ কেন্দ্রীয় বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির অপব্যবহার প্রসঙ্গে শশী বলেন, ‘গণতন্ত্রের উৎসবকে ভয়ের পরিবেশে পরিণত করা হচ্ছে।’ বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য রাহুল সিনহা বলেন, ‘আসল পরিরল্পনাটা হলো তৃণমূল অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে একটা দাঙ্গা লাগানোর। মালদা-মুর্শিদাবাদে সেটা ব্যর্থ হয়েছে। এখন হাওড়া-হুগলি, দুই ২৪ পরগনায় তা করার চেষ্টা করছে। সেটা আগেভাগে আমাদের নামে চালানোর চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর নিজের মন্ত্রক নিয়ন্ত্রিত এজেন্সির সঙ্গে বৈঠক করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। এর মধ্যে আবার গোপনীয়তার কী আছে। তিনি বৈঠক করবেন না তো কি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করবেন?’

  • Link to this news (এই সময়)