• বঙ্গের জন্য পৃথক বেঞ্চ করতে হবে? উষ্মা প্রকাশ সুপ্রিম কোর্টের
    এই সময় | ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোটগ্রহণের আর মাত্র দু’দিন বাকি৷ তার আগেও বাংলায় ভোটার লিস্টে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) নিয়ে প্রতিদিন যে ভাবে একের পর এক অভিযোগ ঘিরে মামলা মেনশন করা হচ্ছে, তা দেখার পরে রীতিমতো ক্ষুব্ধ দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত৷ সোমবার এই মর্মেই প্রধান বিচারপতি নিজেই তাঁর পর্যবেক্ষণে আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ মেনকা গুরুস্বামীর উদ্দেশে বলেন, ‘পরিস্থিতি যা দেখছি, তাতে পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আমাদের আলাদা বেঞ্চ গঠন করলে বোধহয় ভালো হতো!’ মেনকা জানান, এই ক্ষেত্রে শীর্ষ আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সম্পূর্ণ ভাবেই তাদের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়৷ এর পরেই প্রধান বিচারপতি জানান, আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী চাইলে আলাদা করে মামলা দায়ের করতে পারেন, আদালত সংশ্লিষ্ট বিষয় খতিয়ে দেখবে৷

    ঘটনা হলো, সোমবার শীর্ষ আদালতে বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত তিনটি আলাদা মামলা মেনশন করেন তিনজন আইনজীবী৷ সকালে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে একটি মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে গিয়ে বর্ষীয়ান আইনজীবী দেবদত্ত কামাথ অভিযোগ করেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালগুলি ঠিক ভাবে কাজ করছে না। দূর–দূরান্ত থেকে আসা নাগরিকদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালগুলি আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করতে দিচ্ছে না। এমনকী সরাসরি আবেদন জমা নেওয়াও বন্ধ রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বা অনলাইনের আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছেন।’ কামাথের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত বিষয়ে বার বার আবেদন জমা পড়া নিয়ে এ দিন অসন্তোষ প্রকাশ করেন সিজেআই কান্ত। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘দুর্ভাগ্যজনক...। প্রতিদিন আপনারা একের পর এক আবেদন করছেন।’ এর জবাবে কামাথ আবার জানান যে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সঠিক ভাবে পালন করা হচ্ছে না। এই দাবির সমর্থনে বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও তিনি আদালতে পেশ করেন। এর পরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘আমরা আজই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে একটি রিপোর্ট নেব।’ একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।

    ট্রাইব্যুনা‍লগুলি কী ভাবে কাজ করছে, তার বিস্তারিত তথ্য গত দু’দিন ধরে তুলে ধরছে ‘এই সময়’। জুডিশিয়াল অফিসারদের হাতে ‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়া যে ভোটাররা ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাচ্ছেন, তাঁদের শুনানি করে বক্তব্য জানার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গত ১৩ এপ্রিল থেকে কাজ শুরু করেছে বলে আগেই সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে উঠে এসেছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে প্রতিদিন গড়ে ১০টি আবেদনেরও শুনানি হচ্ছে না এখনও পর্যন্ত। ফলে বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্ত ভোটার আদৌ এ বার ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। শীর্ষ আদালত আগের শুনানিতে জানিয়েছিল, ২১ ও ২৭ এপ্রিল (যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ভোটের দু’দিন আগে) পর্যন্ত যাঁদের নামে ট্রাইব্যুনাল সিলমোহর দেবে, তাঁদের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে তুলতে হবে। কিন্তু এখনও যা পরিস্থিতি, তাতে নগণ্য সংখ্যক ভোটারের নামই এ ভাবে লিস্টে ওঠার সম্ভাবনা থাকছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞদের একটা বড় অংশ।

    এই আবেদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিজেআইয়ের বেঞ্চের দ্বারস্থ হন মেনকা৷ তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ফর্ম–৬ ব্যবহার করে ৫-৭ লক্ষ ভোটারের নাম সংযুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন, যা পুরোপুরি অবৈধ পদক্ষেপ৷ মেনকার দাবি, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তিনি এই অভিযোগ জানাচ্ছেন, তাঁর কাছে আলাদা করে কোনও তথ্য নেই৷ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটার তালিকায় নাম সংযুক্তিকরণের বিষয়টি ‘ফ্রিজ়’ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু তা করা হয়নি৷ এইভাবে নতুন ভোটার যুক্ত করার জন্য শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ফর্ম–৬ ব্যবহার করা হয়েছে৷ গোটা বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি৷

    এর পরে আর এক বর্ষীয়ান আইনজীবী সাদান ফারাসাত পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা জনৈক মহিলা ভোটারের হয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিজেআই কান্ত এবং বিচারপতি বাগচীর বেঞ্চের দ্বারস্থ হন৷ তাঁর অভিযোগ, এই মহিলার পাসপোর্ট এবং আধার কার্ড আছে৷ ২০০২–এর ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম আছে৷ তার পর থেকে তিনি নিয়মিত ভাবে রাজ্যের সব নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন৷ কিন্তু এ বার তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাজুডিকেশন’ পর্বে৷ এর পরে তিনি সংশ্লিষ্ট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে আর্জি জানান গত ৩ এপ্রিল৷ অথচ তাঁর আবেদনের শুনানি এখনও হয়নি৷ এ দিকে রাজ্যের ভোটগ্রহণ পর্ব এসে গিয়েছে৷ এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহিলা ভোটারকে ট্রাইব্যুনালে ‘আউট অফ টার্ন’ হিয়ারিং-এর সুযোগ দেওয়া হোক— আর্জি জানান ফারাসাত৷ তাঁর আর্জি গ্রহণ করে প্রধান বিচারপতি জানান, ওই মহিলা ভোটারের জন্য যত দ্রুত সম্ভব ‘আউট অফ টার্ন’ শুনানির ব্যবস্থা করবে ট্রাইব্যুনাল৷

  • Link to this news (এই সময়)