মাছ খাওয়া বন্ধের চেষ্টায় বিজেপি, সল্টলেকের মৎস্যজীবীরা আতঙ্কে, বিধাননগরের কুলিপাড়া-ছয়নাভি-গোরুমারা
বর্তমান | ২১ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘বিজেপি এলে বলবে বাড়িতে মাছ ঢুকতে দেব না, তখন ছয়নাভি, কুলিপাড়া, গোরুমারার হাজার হাজার মৎসজীবী কি করবে? ভিক্ষে করবে?’ বক্তব্য, ভজা মণ্ডলের। ভজাবাবুর বাড়ি ছয়নাভির বি-এইট’য়ে। কালো মিশমিশে গায়ের রং। দড়ি পাকানো চেহারা। বংশপরম্পরায় মাছ ধরার পেশায় যুক্ত। বিজেপির কথা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন।
ছয়নাভি নামটা চেনা চেনা ঠেকে। কিন্তু সল্টলেকের মানুষ ঠিকমতো ঠাহর করতে পারেন না। তারপর শুনলে চমকে যান, যে ছয়নাভির ঠিকানাও সল্টলেক। বিধাননগর পুরনিগমের মধ্যেই পড়ে। বিধানসভা কেন্দ্র হল, বিধাননগর। জায়গাটি ভেড়িপ্রধান। বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে জলাভূমি। সরকারি এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অসংখ্য ভেড়ি আছে। বাইপাস হয়ে সুকান্তনগর দিয়ে এবং সল্টলেক পাঁচ নম্বর সেক্টর হয়ে ঢোকা যায়। সুকান্তনগর, নাওভাঙা, ছয়নাভি, গোরুমারা, কুলিপাড়া অঞ্চলগুলি রয়েছে এখানে। কুলিপাড়া হল বিধাননগরের শেষ প্রান্ত। তার গা লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনার বামনঘাটা। সেটি ভাঙড় বিধানসভা এলাকা। আর গোরুমারা হল অন্য প্রান্ত। তার ঠিক পাশেই বাসন্তী হাইওয়ে। ওপারটা কসবা বিধানসভা। গোরুমারায় দাঁড়ালে সায়েন্স সিটির পাশের বহুতল চোখে পড়ে। ধাপার দুর্গন্ধ নাকে আসে। এই পুরো এলাকাটিই ভেড়ি অঞ্চল। সল্টলেকের করুণাময়ী থেকে চারচাকায় গেলে মেরেকেটে ১৫ মিনিটের রাস্তা। এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের অধিকাংশ মাছ পেশার সঙ্গে যুক্ত। আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করা নিয়ে বিজেপির যে আগ্রাসন এবং আক্রমণাত্মক ভূমিকা, তা দেখে বেজায় ক্ষুব্ধ এই অঞ্চলের অধিকাংশ বাসিন্দা।
একটা সময় পর্যন্ত এই এলাকা তো বটেই, অভিজাত সল্টলেক পর্যন্ত ছিল সুন্দরবনের অংশ। এখনও ছয়নাভি সি-১২ পাড়ায় রাস্তার উপরই রয়েছে বনবিবির মন্দির। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীপক সিং। মাছ ব্যবসার প্রসঙ্গে হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘বিজেপি তো বলে, বাঙালি ঘরে মাছ ঢুকবে না। লোকে খাবে কি?’ দীপকদের এলাকা থেকে গোরুমারা প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তা। দুপুরে স্নান করার আগে বটতলায় বসে গল্প করছিলেন কয়েকজন যুবক। তাঁদের সকলের পদবি মুন্ডা। গোরুমারার ৬৩ জন বাসিন্দা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন একটি ভেড়িতে পাহারার কাজ করেন। তাঁদের একজন প্রসেনজিৎ মুন্ডা। তিনি বলেন, ‘বিজেপি তো মাছ চাষ বন্ধ করে দিতে চায়। আমরা কী করব? কী করে পেট চালাব?’ গ্রীষ্মের বিকেল এখানে খুব নরম হয়ে নামে। প্রখর গরম কমে মনোরম হয় হাওয়া। ভেড়ির বিস্তীর্ণ জলের উপর দিয়ে বয়ে আসার পর হাওয়ায় ভাসে ঠান্ডাভাব। কোথাও ভোটের মিছিল বেরিয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসে কোনো স্ট্রিট মিটিংয়ের বক্তৃতার ছেঁড়া ছেঁড়া বক্তব্য। বক্তৃতার কিছু কিছু ছয়নাভি, কুলিপাড়া, সুকান্তনগর, গোরুমারার মৎসজীবীদের কানে আসে। তাঁরা তা ছেঁড়া ছেঁড়া শুনতে পান। পুরোটা না শুনেও মাছেভাতে থাকা এই মৎসজীবীরা মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছেন, ভোটের মেশিনই হবে তাঁদের প্রতিবাদের অস্ত্র। এখানে ভোট ২৯ তারিখ। সে দিনটি আসতে আর বেশি দেরি নেই। নিজস্ব চিত্র