ভোটে গোলমাল হলে চাকরি খেয়ে নেব, পুলিশকে ফতোয়া কমিশনের
বর্তমান | ২১ এপ্রিল ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আড়াই লক্ষাধিক আধাসেনা রাজ্যে। সাঁজোয়া গাড়ি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্তাদের ‘কনফারেন্স’। তারপরও ভোটের যে কোনো ঝামেলার দায় এই রাজ্যের পুলিশকর্মীদের! কারণ, নির্বাচনের দিন অশান্তি ঠেকাতে এবার রাজ্যের আইসি-ওসিদের চূড়ান্ত ফতোয়া জারি করেছে কমিশন। ভোটে ঝামেলা হলে চাকরি খোয়াতে হবে—ঠিক এই ভাষাতেই থানার ‘বড়োবাবু’দের হুঁশিয়ারি দিয়েছে কমিশন। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, এই সমীকরণে ছাড় পাবেন না পুলিশ সুপার-কমিশনাররাও। বিজেপির সঙ্গে কমিশনের আঁতাত নিয়ে এসআইআর পর্বের শুরু থেকেই তোপ দেগে চলেছে তৃণমূল। আর এই নির্দেশিকার পর তাদের কটাক্ষ, আড়াই লাখ বাহিনী এনেও আত্মবিশ্বাস আসছে না? সেই রাজ্যের পুলিশের কাঁধেই বন্দুক রাখতে হচ্ছে?
জানা যাচ্ছে, কমিশনের জারি করা নির্দেশে আইসি-ওসিদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভোটের দিন নিজ নিজ এলাকায় যে কোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে হবে। এলাকায় কোনো ঝামেলা হলে কর্মজীবনে বড়ো মূল্য চোকাতে হবে। সরাসরি চাকরি হারাতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শুধু ওসি আইসিরাই নন, সর্বোপরি দায়িত্ব থাকবে পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপারদের উপর। তাঁরাও রেহাই পাবেন না বলে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তা এবং আইসি-ওসিদের মনোজ আগরওয়াল বলে দিয়েছেন, ‘ভোটের দিন রাস্তায় অস্ত্র, বোমা, গুলি পাওয়া গেলে আপনারা রেহাই পাবেন না। কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে কমিশন।’
জানা যাচ্ছে, ভোটের দিন সংশ্লিষ্ট থানা এলাকায় শান্তি বজায় রাখার যাবতীয় দায়িত্ব থাকবে ওসি-আইসিদের। ঝামেলা বা অশান্তির খবর মিললে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে তাঁদের। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের ভূমিকা খতিয়ে দেখবে কমিশন। যদি দেখা যায় কর্তব্যে গাফিলতি রয়েছে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে প্রথমে সাপসেন্ড করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ করা হবে। এবং শো-কজ। তদন্তে গাফিলতি প্রমাণিত হলে এবং শো-কজের জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআরের পাশাপাশি তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। সমান রোষের মুখে পড়বেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাথায় থাকা আধিকারিকরাও। পাশাপাশি, জামিন অযোগ্য এবং জামিনযোগ্য পরোয়ানা থাকা অভিযুক্তদের ১০ দিনের মধ্যে গ্রেপ্তারির যে নির্দেশ নির্বাচন কমিশন জারি করেছিল, সেই বিষয়েও থানাগুলির ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত হিসাব চাওয়া হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। কমিশন আগে জানিয়েছিল, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে কোনো সিভিক ভলান্টিয়ারদের যুক্ত করা যাবে না। এবার নির্দেশিকা জারি করে কমিশন জানিয়ে দিল, ভোটের তিনদিন আগে সমস্ত সিভিক পুলিশ, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশকর্মীকে পুলিশ লাইনে পাঠিয়ে দিতে হবে। রাজ্যের সব পুলিশ সুপার এবং কমিশনারের কাছে সিভিকদের নিয়ে পাঠানো ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো সিভিক, ভিলেজ পুলিশ বা গ্রিন পুলিশকে নির্বাচনের সব দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে। তবে নির্বাচনের বাইরে যে কোনো কাজ তাঁরা করতে পারবেন। এছাড়াও সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম, গ্রিন পুলিশেরা অবশ্যই ভোট দিতে যেতে পারবেন বলে জানিয়েছে কমিশন। তবে ইউনিফর্ম পরে নয়, সাধারণ পোশাকে অন্য ভোটারদের মতোই ভোটদান করতে পারবেন তাঁরা।
কমিশনের ফরমানে অবশ্য জাঁতাকলে পড়েছেন এবার প্রিসাইডিং অফিসাররাও। তাঁদের জন্য কমিশনের নয়া নির্দেশিকা, বুথে যাওয়ার আগে মুচলেকা দিতে হবে। একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কমিশন জানিয়েছে, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ২০ মিনিট থেকে আধঘণ্টার একটি ট্রেনিং হবে। তারপর প্রিসাইডিং অফিসারদের দিতে হবে মুচলেকা। এই নির্দেশিকা ঘিরে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসারদের প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশন কি ভোটের সমস্ত দায়িত্ব তাঁদের উপর চাপিয়েই দায় সারতে চাইছে?