• রহস্য আর আবেগের ওম দিয়ে বোনা, নতুন মোড়কে হাজির করেছে ওয়েব সিরিজ় ‘ঠাকুমার ঝুলি’
    এই সময় | ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির মননজগতের সঙ্গে রহস্য আর গোয়েন্দা কাহিনির যোগাযোগ চিরকালীন। সেই চেনা আকর্ষণকেই নতুন মোড়কে হাজির করেছে ওয়েব সিরিজ় ‘ঠাকুমার ঝুলি’। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র গিরিজাবালা দেবী। একজন প্রবীণা, যিনি মধ্যবিত্ত জীবনের গণ্ডির মধ্যেই নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় একের পর এক রহস্যের সমাধান করেছেন। প্রচলিত গোয়েন্দা চরিত্রদের থেকে তিনি আলাদা। অভিজ্ঞতা আর সংযমই তাঁর প্রধান অস্ত্র।

    গল্পের পটভূমি বিষ্ণুপুরের মল্লপুর। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠা গিরিজাবালার একমাত্র সঙ্গী তাঁর নাতনি যাজ্ঞসেনী। বিদেশ থেকে কয়েক দিনের জন্য দেশে ফিরে ঠাকুমার কাছে সময় কাটাতে আসে সে। কিন্তু একটি বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে হঠাৎ ঘটে যাওয়া মৃত্যুর ঘটনায় গল্পের মোড় ঘুরে যায়। আম্রপালী সিংহরায় নামক এক চরিত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রথমে দুর্ঘটনা বলে মনে হয় অনেকের। কিন্তু গিরিজাবালা তা মেনে নিতে পারেন না। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অনুসন্ধান। এর পর একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনার জেরে রহস্য আরও ঘনীভূত হতে থাকে।

    ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করা নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পৌঁছে যান থানায়। যেখানে পুলিশ অফিসার বৃহস্পতি মল্লিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গিরিজা এবং যাজ্ঞসেনীর সত্যাণ্বেষণে জুড়ে যান বৃহস্পতিও। তদন্ত এগোতে থাকে দুই প্রজন্মের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধনে। এটুকু শুনে রহস্যের অলিগলিতে পা ফেলতে ইচ্ছে করছে তো? স্বাভাবিক। তবে গল্পটা বলে দিলে নির্মাতাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। ‘কী জানি কী হয়’-এর উত্তর পেতে দেখতে হবে সিরিজ়টা।

    গিরিজাবালার চরিত্রে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় এক নতুন আঙ্গিকে ধরা দিয়েছেন। বৃদ্ধার চরিত্রে প্রথমবার অভিনয় হলেও, তাঁর সাবলীলতা চোখে পড়ার মতো। কখনও স্নেহময়ী ঠাকুমা, কখনও আবার তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা, এই দুই সত্তাকে তিনি সুন্দর ভাবে একসঙ্গে বয়ে নিয়ে গিয়েছেন। নাতনির চরিত্রে দিব্যাণী মণ্ডল-এর উপস্থিতিও যথাযথ, বিশেষ করে তদন্তে তাঁর অংশগ্রহণ গল্পকে আরও গতিময় করেছে।

    সিরিজ়ের অন্যতম বড় প্রাপ্তি রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতি মল্লিকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় নিখুঁত এবং গভীর। সংলাপের ভেতর যেমন শক্তি, তেমনই নীরবতাতেও তাঁর অভিনয় সমান ভাবে নাড়া দিয়েছে। সংলাপের সংযম, চোখের ভাষা— সব মিলিয়ে তিনি চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন। গল্পের নির্মাণেও রয়েছে এক আলাদা স্বাদ। রহস্যের পরত ধীরে–ধীরে খোলে।

    তাড়াহুড়ো নেই, আবার একঘেয়েমিও নেই। বরং প্রতিটি পর্বে গল্প একটু-একটু করে আরও গভীর হয়। গল্প বুননের এই শক্ত ভিতের নেপথ্যে রয়েছেন চিত্রনাট্যকার সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। সূক্ষ্ম লেখনিতে তিনি রহস্য আর আবেগের এক সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছেন। অয়ন চক্রবর্তী-র পরিচালনায় সব মিলিয়ে এটি শুধু গোয়েন্দা সিরিজ় নয়, এটি স্মৃতি, সম্পর্ক আর আবেগ দিয়ে বোনা এক কাঁথার মতো। যা জড়িয়ে নিলে ছেলেবেলার চেনা ওম পাওয়া যায়।
  • Link to this news (এই সময়)