রায়গঞ্জ
একদা কংগ্রেসের গড়ে এখন শুধুই দুই ফুলের দাপাদাপি। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপির কৃষ্ণ কল্যাণী তৃণমূলের কানাইয়ালাল আগরওয়ালকে ২০৭৪৮ ভোটে পরাজিত করেন। পরবর্তী সময়ে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগদান করে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন তিনি। লোকসভায় হারলেও সেই বছর বিধানসভা উপনির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে ফের বিধায়ক হন কল্যাণী। ব্যবধান ছিল ৫০০৭৭। পাঁচ বছরের মেয়াদকালে দুই ফুলের বিধায়ক হয়ে বিরল নজির গড়েছেন কল্যাণী। এ বার তাঁর সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে রয়েছেন বিজেপির কৌশিক চৌধুরী, প্রাক্তন বিধায়ক কংগ্রেসের মোহিত সেনগুপ্ত এবং সিপিএমের জীবানন্দ সিংহ। গত লোকসভা ভোটের নিরিখে এই কেন্দ্রে ৪৭ হাজার ভোটে বিজেপি এগিয়ে। এর উপরে 'সার'-এ প্রায় ১৩৬৫৯ জনের নাম বাদ গিয়েছে। এর মধ্যে বহু সংখ্যালঘু ভোটারের নাম বাতিল হওয়ায় তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনুমান রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
কালিয়াগঞ্জ
গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী সৌমেন রায় জয়ী হন ২১৮২০ ভোটে। জিতে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। পরে আবার পুরোনো দলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। না ঘরকা-না ঘাটকা হয়ে তিনি এ বার কোনও ফুলের হয়েই টিকিট পাননি। এবার এই কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের নিতাই বৈশ্য, বিজেপির উৎপল মহারাজ, কংগ্রেসের গিরিধারী প্রামাণিক এবং সিপিএমের হিরু রায় সরকার। গত লোকসভা ভোটের নিরিখে এই কেন্দ্রে প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে বিজেপি এগিয়ে। কালিয়াগঞ্জে ৩৮ শতাংশ রাজবংশী ভোটার। তাঁরাই নির্ণায়ক শক্তি। উৎপল মহারাজ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেরুয়া পোশাক পরে ঘুরছেন গ্রাম-শহর-মফসসলে। গতবার জয়-পরাজয়ের ব্যবধান এতটাই বেশি ছিল যে 'সার' এখানে খুব একটা ফ্যাক্টর হবে না। ভোটার তালিকা থেকে ৬৪১১ জনের নাম বাদ গিয়েছে। সংখ্যালঘু প্রধান জেলায় এই আসনের দিকে নজর সকলের।
হেমতাবাদ
গত বিধানসভা ভোটে এই আসনে ২৭২১৫ ভোটে জিতে মন্ত্রী হন তৃণমূলের সত্যজিৎ বর্মন। এবার তাঁর লড়াই বিজেপির হরিপদ বর্মন এবং সিপিএমের তনুশ্রী দাস, কংগ্রেসের অনামিকা রায়ের সঙ্গে। অবশ্য লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে প্রায় ৬৫০০ ভোটে বিজেপি এগিয়ে ছিল। কলেজ এবং দমকল কেন্দ্র তৈরি না হওয়ায় এলাকাবাসীর ক্ষোভ রয়েছে। এই কেন্দ্রে 'সার'-এ নাম বাদ গিয়েছে। ১৮২১৫ জনের। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে মূল লড়াই হলেও সিপিএম এবং কংগ্রেস প্রার্থী কতটা ভোট কাটবেন, তার উপরে ফলাফল নির্ভর করবে।
করণদিঘি
গত নির্বাচনে তৃণমূলের গৌতম পাল ৩৬৬২৬ ভোটে জয়ী হন। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ২১ হাজার ভোটে এগিয়ে যায় বিজেপি। এ বার গৌতমের বিরুদ্ধে রয়েছেন বিজেপির বিরাজ বিশ্বাস, সিপিএমের মহম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং কংগ্রেসের মুর্শিদ আলম। এখানে 'সার'-এ বাদ গিয়েছে ৩১৫৬২ জন ভোটারের নাম। যার সিংহভাগ সংখ্যালঘু। তার উপরে সিপিএম ও কংগ্রেস প্রার্থী সংখ্যালঘু। সিপিএমের সাহাবুদ্দিনকেও কিন্তু এখানে উপেক্ষা করা যাবে না। কারণ তিনি পরিচিত শিল্পপতি। ফলে চাপে রয়েছেন গৌতম।
ইটাহার
৪৩৯৭৫ ভোটে জিতে ২০২১-এ বিধায়ক হয়েছিলেন তৃণমূলের মোশারফ হোসেন। গত লোকসভা ভোটেও তৃণমূল প্রার্থী প্রায় ৩২ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। তাই অঙ্কের বিচারে এটি শাসকদলের 'সেফ' সিট। মোশারফ ছাড়াও ময়দানে আছেন কংগ্রেসের অমল আচার্য, বিজেপির সবিতা বর্মন এবং সিপিআইয়ের উৎপল দাস। এখানে তৃণমূলের বাড়া ভাতে ছাই দিতে পারেন কংগ্রেস প্রার্থী অমল। তিনি ইটাহারে ২০১১-২০২১ পর্যন্ত তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন। সাত বছর সামলেছেন জেলা তৃণমূলের সভাপতির পদ। এলাকায় তাঁর দাপট রয়েছে। এছাড়া প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিধায়ক শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক উৎপলেরও একটা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। 'সার'-এর কোপ পড়েছে ১৮৭৫৪ জনের উপরে। সেটা ফ্যাক্টর হবে কি না, তা সময়ই বলবে।
ইসলামপুর
১১ বারের বিধায়ক আব্দুল করিম চৌধুরীকে সরিয়ে এখানে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন কানাইয়ালাল আগরওয়াল। আছেন বিজেপির চিত্রজিৎ রায়, কংগ্রেসের গুড্ডি রিয়াজ এবং সিপিএমের সামি খানও। গত বিধানসভা ভোটে করিম ৩৭,৪৪০ ভোটে জিতেছিলেন। লোকসভাতেও এগিয়ে ছিল ঘাসফুল। অঙ্ক তৃণমূলকে এগিয়ে রাখলেও এ বার লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। করিম না থাকায় তাঁর অনুগামীদের নিয়ে একটা সংশয় রয়েছে, একই সঙ্গে প্রবীণ নেতার অনুপস্থিতিতে বাম ও কংগ্রেসের সংখ্যালঘু প্রার্থীর দিকে কিছুটা ভোট চলে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। 'সার'-এর ধাক্কায় ১৫,৩৪৮ জনের নাম বাদ গিয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশই সংখ্যালঘু। কংগ্রেস ও বাম প্রার্থীরা এখানে কত ভোট পান, তার উপরে নির্ভর করতে পারে ফলাফল। তবে সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখতে পারলে চিন্তা নেই কানাইয়ালালের।
চোপড়া
এই কেন্দ্রে প্রায় ৬৩ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক হামিদুল রহমানের আধিপত্য একচেটিয়া। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সত্ত্বেও হামিদুলের দুর্গে ছিদ্র হয়নি। মাঝেমধ্যে জেসিবি-র মতো অনুগামীদের কীর্তিকলাপ তাঁকে সাময়িক অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে এ বার ভোটের মুখে তাঁর কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছেন কংগ্রেস প্রার্থী জাকির আবেদিন। তিনি এই বিধানসভা কেন্দ্র হাতের তালুর মতো চেনেন। তাই গত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৯২ হাজার ভোটে লিড থাকা সত্ত্বেও চোপড়া কিছুটা হলেও চিন্তায় রেখেছে তৃণমূলকে। 'সার'-এ ২৭৭৯৪ জনের নাম বাদ গিয়েছে। 'সার' ও কংগ্রেস প্রার্থীর উপরে ভর করে অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টায় খামতি রাখছেন না বিজেপির শঙ্কর অধিকারীও।
গোয়ালপোখর
হাতে পুঁজি ৭৩০০০ ভোটের ব্যবধান। গত বিধানসভা ভোটের এই বিশাল ব্যবধান হাতে নিয়ে ফের লড়াইয়ের ময়দানে রাজ্যের মন্ত্রী গোলাম রব্বানি। গোড়ায় ভোটার তালিকায় রব্বানির নাম ওঠেনি, পরে নাম ওঠায় আদাজল খেয়ে নেমেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির সরজিৎ বিশ্বাস ও কংগ্রেসের নাসিম আহসান। গোয়ালপোখরে ভুট্টার সঠিক দাম না পাওয়া এবং এলাকায় বড় কোনও হিমঘর তৈরি না হওয়ায় ক্ষোভরয়েছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাটের বেহাল দশা নিয়ে ভোটারদের একাংশের মধ্যে রয়েছে হতাশা। এই কেন্দ্রের প্রচুর মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁরা ভোট দিতে আসবেন কি না, সেটা একটা বড় ফ্যাক্টর। 'সার'-এর চূড়ান্ত তালিকায় ৩১৫২৪ জনের নাম বাদ পড়েছে। রব্বানির জয়ের ক্ষেত্রে যা কাঁটা হয়ে উঠতে পারে।
চাকুলিয়া
এই কেন্দ্রে ফের ঘাসফুলের প্রার্থী হয়েছেন মিনহাজুল আরফিন আজাদ। তাঁর বিরুদ্ধে পদ্ম প্রার্থী ব্যবসায়ী মনোজ জৈন। আর রয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী আলি ইমরান রামজ ওরফে ভিক্টর। কংগ্রেস রাজ্যের যে ক'টি আসনকে 'পাখির চোখ' করেছে, তার মধ্যে রয়েছে এই কেন্দ্র। এখানে লড়াইটা আক্ষরিক অর্থেই ত্রিমুখী। গত বিধানসভায় ৩৩৮০০ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন মিনহাজুল। লোকসভায় ব্যবধানও মোটামুটি একইরকম ছিল। এখানে সংখ্যলঘু ভোটের পাশাপাশি রাজবংশী ভোটও প্রচুর রয়েছে। 'সার'-এর জেরে ১৩৬৯৫ জনের নাম নেই তালিকায়। স্থানীয় ইস্যুকে ছাপিয়ে গিয়েছে ভোট কাটাকাটির অঙ্ক। সংখ্যালঘু ভোট যদি দুই কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, আর বাকি ভোট যদি বিজেপি প্রার্থীর ঝুলিতে পড়ে, তাহলে 'মিরাকল' হতেও পারে।
তথ্য সহায়তা: নীলাঞ্জন দাস, বিশ্বরূপ বিশ্বাস