রায়গঞ্জ
রবিবারের সন্ধ্যা। রায়গঞ্জের বাসিন্দা বিক্রম দাস একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী। কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে একটি বারে ঢোকেন। ইচ্ছে ছিল, দু'পেগ খেয়ে বাড়ি চলে যাবেন। এক পেগ খেতে না-খেতেই বারের ম্যানেজার এসে তাঁকে চলে যেতে বললেন। কেন? রাত ন'টার মধ্যে বার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। কোনওমতে আর একটি পেগ ঢক ঢক করে শেষ করে বিল মিটিয়ে বার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলেন বিক্রম। সোমবার তিনি বলেন, 'ভেবেছিলাম বাইরে অফশপ থেকে বোতল কিনে বাড়ি যাব। ওমা, গিয়ে দেখি সব বন্ধ।' এই সুযোগে শুরু হয়েছে মদের কালোবাজারি। রায়গঞ্জের আর এক বাসিন্দা সুমন রায় বলেন, 'সন্ধ্যার পর থেকেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। বারে গিয়ে দেখি বন্ধ। ব্ল্যাকে কিনতে গিয়ে দেখি ৫০০ টাকার মদ বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১,৫০০ টাকায়।' সুরাপ্রেমী কুশান সরকারের আফসোস, 'আগে জানলে কয়েক দিনের জন্য স্টক করে রাখতাম। এত আগে বন্ধ করে দেওয়া একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না।' রায়গঞ্জের একটি বারের মালিক বলেন, 'রবিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে মেসেজ আসে যে, রাত ন'টার মধ্যে বার বন্ধ করতে হবে। তখন বার-ভর্তি কাস্টমার। বাধ্য হয়ে বিক্রি বন্ধ করতে হলো। কাস্টমারদের কার্যত হাতেপায়ে ধরে অনুরোধ করে বের করতে হয়।'
মালবাজার
একই ছবি মালবাজারে। সুরাপ্রেমীদের পরিকল্পনা ছিল, মঙ্গলবার দু'দিনের জন্য মদ স্টক করে নেওয়ার। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় নির্বাচন কমিশন অতর্কিতে জল ঢেলে দেওয়ায় তাঁরা হতাশ। বিভিন্ন সূত্রের খবর, আচমকা নির্দেশ আসায় মালবাজার-সহ জলপাইগুড়ির নানা এলাকায় ধাবা, গুমটি কিংবা অবৈধ মদের দোকানগুলিতেও স্টক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সেই সব জায়গায় গিয়ে ইতিমধ্যেই সতর্ক করা শুরু করেছে। জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রামীণ) উজ্জ্বল ঘোষ বলেন, 'ভোটের সময়ে যে কোনও উপায়ে অবৈধ ভাবে মদ বিক্রি বন্ধ করতে আমরা প্রস্তুত।' ডুয়ার্স এবং পাহাড়ে মদ্যপানের প্রবণতা একটু বেশি। কমিশনের আচমকা সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। মালবাজারের বাসিন্দা সৌরভ গুপ্ত বলেন, 'একটি অনুষ্ঠানের জন্য সোমবার তিন-চার বোতল মদ প্রয়োজন ছিল। সেটা জোগাড় করতে পারিনি। অতিথিদের কী বলব বুঝতে পারছি না।'
শিলিগুড়ি
সবচেয়ে বেশি হাহাকার শিলিগুড়ি শহরে। উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার-পাব রয়েছে এখানেই। মদের দোকানের সংখ্যাও কম নয়। রবিবার রাত থেকে সর্বত্র নিস্তব্ধতা। এমনিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান বন্ধ থাকলে অবৈধ ভাবে যাঁরা মদ বিক্রি করেন, তাঁদের রমরমিয়ে ব্যবসা হয়। অনেক বেশি দামে মদ বিক্রি করেন তাঁরা। অন্যবার ভোটের সময়ে দু'দিন ব্যাপক ব্যবসা হয় তাঁদের। কিন্তু এ বার আচমকা চার দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ আসায় তাঁরা আগে থেকে মদ কিনে স্টক করার সুযোগ পাননি। ফলে শহরজুড়ে ভোটের সময়ে অবৈধ উপায়ে মদ বিক্রিও কমে যাবে বলে অনুমান সুরাপ্রেমীদের। আবার এতে ভেজাল মদের বিক্রিও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। শিলিগুড়ি ওয়াইন শপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা শুভেন্দু দাস বলেন, 'চার দিন দোকান কিংবা বার বন্ধ রাখার নির্দেশ এসেছে, আমরা কেউ এর আঁচ করতে পারিনি। এমনকী, ২৩ এপ্রিল ভোট শেষ হওয়ার পরেও দোকান খোলা যাবে না। ফলে ভেজাল এবং সস্তার মদের বিক্রি বাড়তে পারে।'
কোচবিহার
কোচবিহার জেলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে আশঙ্কা মদের দোকানের মালিকদের। এর প্রভাব সরকারি রাজস্বেও পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা। আবগারি দপ্তর সূত্রে খবর, কোচবিহার জেলায় সবমিলিয়ে ৮০টি মদ বিক্রির জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে অফশপ, ভাটিখানা, রেস্টুরেন্ট কাম বার রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন অন্তত এক কোটি টাকার মদ বিক্রি হয় জেলায়। রবিবার রাত সমস্ত জায়গায় মদ বিক্রি বন্ধ। বেআইনি ভাবে যে সমস্ত জায়গায় মদ বিক্রি হয়, সেগুলি বন্ধ করতে মাঠে নেমেছে আবগারি দপ্তর। জেলায় সব মিলিয়ে সাতটি টিম তৈরি করা হয়েছে।
মালদা
মালদায় অবশ্য রবিবার রাত পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে পানশালা এবং অফশপে তালা ঝুলতে দেখা যায়। এই দৃশ্যে মাথায় হাত পড়েছে সুরাপ্রেমীদের। বেআইনি ভাবে মদ বিক্রি করেন যাঁরা, তাঁদের আফসোস, 'ইশ। আগে জানলে অনেক টাকা ইনভেস্ট করা যেত। রাতারাতি দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে মালামাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।' জেলা আবগারি দপ্তর সূত্রে খবর, মালদায় অফ কাউন্টার, অনশপ এবং পানশালা মিলিয়ে প্রায় ১৬০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান রয়েছে। ইংরেজবাজার শহরেই রয়েছে প্রায় ৭০টি দোকান ও পানশালা। এ দিন থেকে সর্বত্র তালা। কমিশনের এই সিদ্ধান্তে মহিলাদের একাংশ অবশ্য খুশি। তাঁদের বক্তব্য, 'মদ-মাংসের উৎসবটা এ বার বন্ধ হবে।'
বালুরঘাট
নির্দেশ অনুযায়ী রাত ন'টার মধ্যেই সমস্ত মদের দোকান বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও বালুরঘাট শহরে রাত ১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা ছিল বলে খবর। তবে এ দিন সকাল থেকে সর্বত্র তালা বুলছে। শহরের বাইরেও একই ছবি। জেলার প্রায় ৫০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান বন্ধ। তবে বালুরঘাট, গঙ্গারামপুরে কালোবাজারি শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ। মদের বোতল পিছু ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ উপায়ে মদ বিক্রি বন্ধ করতে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ। বালুরঘাটের এক সুরাপ্রেমী বলেন, 'আগাম জানিয়ে দেওয়া হলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হতো না।'
(তথ্য: সঞ্জয় চক্রবর্তী, নীলাঞ্জন দাস, সব্যসাচী ঘোষ, চাঁদকুমার বড়াল, কৌশিক দে ও রূপক সরকার)