মাস্টার প্ল্যানের প্রতিশ্রুতি থেকে দিলীপের ‘ঘরে ফেরা’, জঙ্গলমহলের লালমাটিতে ফুটবে কোন ফুল?
প্রতিদিন | ২২ এপ্রিল ২০২৬
ঘন শালবনের মাঝখান চিড়ে গিয়েছে কালো পিচের জাতীয় সড়ক। কিছু দূর এগোলেই বিনপুর। বাম আমলে এই এলাকা ছিল মাওবাদীদের ডেরা। এখন আর মাওবাদীদের প্রভাব নেই। এলাকারই এক বাসিন্দা বলেন, “ভয়ের সেই জীবন এখন আর নেই।” কেশিয়াড়ি এলাকায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। কোথায় যাচ্ছেন, জিজ্ঞাসা করতেই ওপাশ থেকে এক শব্দের উত্তর, ‘কাজে’।
অনতিদূরে রাস্তার ধারের এক ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকানি ব্যস্ত নিজের কাজে। কয়েক জন খদ্দেরও আছে৷ তাঁদেরই একজন বলে উঠলেন, “সব কাজে যাচ্ছে কটক, বালেশ্বরে। সকালে যায়, আবার রাতে ফেরা।” একটু ঘুরলে জানা গেল, সীমানা পেরলেই ওড়িশা। কাজের জন্য পাশের রাজ্যে বহু তরুণ, যুবকরাই ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে। কটক, বালেশ্বরে দিনমজুরের কাজ করে অনেকে। কেউ কেউ কারখানাতেও কাজ করে। এখানে কি কাজ নেই? একজন বলে উঠলেন, “নেই বলাটা ভুল। কাজ আছে। তবে আরও কাজ চাই। আরও কাজের জায়গা বাড়াতে হবে।”
পশ্চিম মেদিনীপুরে কেশিয়ারি, দাঁতন, নারায়ণ গড়-সহ বেশ কিছু এলাকা থেকে মানুষজন এভাবেই পাশের রাজ্যে কাজে যায়। সকালে কাজে গিয়ে, সন্ধেবেলা এলাকায় ফিরে আসা। বামআমলে কি তাহলে কাজ ছিল? এক প্রৌঢ় বলে উঠলেন, “সে সময় কাজ থাকবে কি? তখন তো খুনের রাজনীতি চলছে। একদিকে মাওবাদীরা, অন্যদিকে সিপিএম। প্রায়ই গুলির লড়াই হত যৌথবাহিনী-মাওবাদীদের। লাশ পড়ত।”
রাঢ় বাংলার পশ্চিমের এই জেলা জঙ্গলমহল ছিল মাওবাদীদের আস্তানা। সেসময় জঙ্গলে রাজ করতেন মাও নেতা কিষেণজি, শশধর মাহাতোরা। সিপিএমের পার্টি অফিস পুড়েছে। সিপিএম কর্মীদের রক্তে লাল হয়েছে গ্রামের মাটি। সবসময় মাওবাদীদের নজর থাকত গ্রামের উপর। কারা আসছে, কী হচ্ছে? সব সময় ভয়ে তটস্থ থাকত সাধারণ মানুষ। এই কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই ঝিটকার জঙ্গল। সেখানেই বাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মারা গিয়েছিলেন কিষেণজি, মাওনেতা শশধর মাহাতোরা। বেলদার বাসিন্দা এক বৃদ্ধ বললেন, “তৃণমূল সরকারের আমলে এলাকায় শান্তি ফিরেছে। এলাকার গরিব পরিবারগুলো কাজকম্ম করছে। মহিলারাও কাজ করছে।”
জঙ্গলমহলের এই জেলার অবস্থা কী? কেমন আছে জেলার মানুষজন? ভৌগোলিক বিচারে এই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জঙ্গল। এছাড়াও আছে চাষের জমি৷ কাঁসাই, কেলেঘাই-কপালেশ্বরী এঁকেবেঁকে জেলার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে৷ সাধারণ মানুষজন বলে, এখানে সবই যেন বেশি বেশি। রুখাসুখা এই জেলা বৈশাখ পড়লেই যেন তেতেপুড়তে থাকে। জল শুকিয়ে যায় পুকুর, নদীর। আবার বর্ষা এলেই দুশ্চিন্তা। ভেসে যাবে না তো এবার সব কিছু? প্রায় প্রতি বর্ষার জেলার ঘাটাল-সহ একাধিক এলাকায় বন্যা দেখা যায়। উঁচু স্কুলবাড়িতে হাতের কাছের জিনিসপত্র নিয়ে উঠে যাওয়া। জল কমলে ঘর মেরামত করতে করতেই পুজো এসে যায়। একদমে এসব বলে থামলেন ফি বছর বন্যাপ্লাবিত ঘাটালের এক কৃষক। রাজ্য সরকার ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত করছে। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই শুনে আরেক জন পাশ থেকে বলে উঠলেন, “কাজ আগে শেষ হোক।”
দোরগোড়ায় বিধানসভা ভোট। চাওয়া-পাওয়া, দাবিদাওয়া নিয়ে ভোটের লড়াই। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই জেলায় দীর্ঘ সময় ধরেই চালকের আসনে। তবে খড়গপুর সদর বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। দিলীপ ঘোষের খাসতালুক। এবারও কি ফলাফল তাদের দিকেই থাকবে? নাকি লালমাটির সরানে পদ্ম ছড়িয়ে পড়বে একাধিক কেন্দ্রে?
জেলার রাজনীতি…
শুরু থেকেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সিপিএমের লাল দুর্গ ছিল। আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক তাদের পক্ষে। ২০০৮ সালে শালবনিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কোনও আঁচ লাগেনি। কিন্তু একটি গাড়িতে থাকা কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী জখম হয়েছিলেন। শালবনির জিন্দলদের কারখানা শিলান্যাস করতে গিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও সেই সময়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামবিলাস পাসওয়ান। ওই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বাংলাকে। তারপরের ঘটনা আরও বিভীষিকাময়। জঙ্গলমহলে গাছ ফেলে, রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। শুরু হয় লালগড় আন্দোলন। গোটা জঙ্গলমহল কব্জা করে মাওবাদীরা।
শশধর মাহাতো কিষেণজি-সহ একাধিক বড় মাও নেতা জঙ্গলমহলে সে সময় থাকতেন। রাজধানী এক্সপ্রেস আটকে দেওয়া, থানার ওসিকে তুলে অপহরণ, লালগড়ের সিপিএম পার্টি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া, সিপিএম কর্মীকে খুন করে রাস্তায় লাশ ফেলে রাখা, শিলদার ইএফআর ক্যাম্পে হামলা–একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। সিপিএমের সংগঠনও ভেঙে যায় এলাকায়। বিনপুরের সেই সময়ের এক সিপিএম কর্মী বলেন, “মাওবাদীদের হামলা সেসময় ছিল এক বড় চক্রান্ত।”
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল হয়। লাল মাটির রঙ কয়েক বছরে বদলে সবুজ। কিষেণজির মৃত্যুর পর জঙ্গলমহলের সেই ভয়ের পরিবেশ কমতে থাকে। তাহলে কি এই জেলার তৃণমূল আমলে অনেক উন্নতি হয়েছে? পিংলা, সবং এলাকার বহু মানুষ জানিয়েছেন, উন্নতি আরও হওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নতি হয়েছে। মেয়েদের হাতের কাজ এখন বাইরেও যাচ্ছে। এই জেলা পটচিত্র, বাঁশের কাজ, বিভিন্ন সৌখিন জিনিস তৈরিতে অন্যতম। মুখ্যমন্ত্রী জেলার কুটির শিল্পকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। সবংয়ের এক গৃহবধূ বলেন, “এখন হাতে ভালোই কাজ থাকে। গ্রামের মেয়ে-বউরা সবাই কাজ করে।”
জঙ্গলমহলের মানুষের, বিশেষ করে মহিলাদের জীবনযাত্রার বদল আনা হবে বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটু একটু করে অন্ধকার কেটে আলো আসছে জেলার প্রান্তিক অঞ্চলের মহিলাদের জীবনে। ঘাটালের এক মহিলা বলেন, “দিদি প্রতি মাসে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে দেড় হাজার টাকা দিচ্ছে। মেয়েরা পড়ার টাকা পেয়েছে। স্কুল থেকে সাইকেলও দিয়েছে।”
এবার ভোটে নজরকাড়া প্রার্থী…
জেলার মোট ১৬টি আসনের মধ্যে ১৫টিতে ২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। শতাংশের বিচারে ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের দিকে ভালো পরিমাণেই রয়েছে। ২০১৬ সালে খড়গপুর সদর আসনে জ্ঞানসিং সোহন পাল (চাচা)কে হারিয়ে দিলীপ ঘোষ বিধানসভায় গিয়েছিলেন।২০১৯-এ দিলীপ ঘোষকে লোকসভা আসনে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। দিলীপের আমল থেকেই ওই খড়গপুরে বিজেপির প্রভাব বাড়তে থাকে। গত ছয় বছরে পদ্মের বন বেড়েছে অনেকটাই। গত লোকসভা নির্বাচনে জেলায় ছিলেন না দিলীপ। দল ধাক্কা খায়। এবার ফের তিনি তাঁর খাসতালুকে। চায়ে পে চর্চা থেকে, রাস্তায় জন্মদিনের কেক কাটা, রামনবমীতে লাঠিখেলা থেকে কর্মিসভায় ঝাঁঝালো বক্তব্য সবই দেখা যাচ্ছে। এক বিজেপি কর্মী বলেন, “দিলীপদা এসে গিয়েছে মানে ভরসা অনেক বেড়ে গেল। এবার আরও ভালো ফল হবে।”
কেবল দিলীপ ঘোষই নয়, মেদিনীপুর আসন থেকে জয়ী তৃণমূল সাংসদ জুন মালিয়াও আছেন৷ এছাড়াও ঘাটাল কেন্দ্রের সাংসদ অভিনেতা সুপারস্টার দেব। টলিউডের দুই স্টার এই জেলার তৃণমূলের দুই মুখ। তাঁরা প্রচারেও থাকছেন। ফলে তৃণমূলও বাড়তি অক্সিজেন নিয়েই প্রচার চালাচ্ছে। এছাড়াও রাজ্য রাজনীতির দীর্ঘদিনের মুখ, সেচমন্ত্রী মানস ভুইয়াও এই জেলার৷ এবারও তিনি সবং থেকে তৃণমূলের প্রার্থী।
কোন ফ্যাক্টরে এবার ভোট?
তৃণমূলের গড় পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গায় উঠে এসেছে একাধিক ইস্যু। উন্নয়ন ও অনুন্নয়নের প্রচার পাল্টা প্রচার চলছে শাসক-বিরোধী র্যালি, সভা থেকে। কেশিয়াড়ি অঞ্চলের গৃহবধূ বলেন, “সরকার থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাই। তৃণমূলের লোকজন বলেছে আরও সুবিধা আগামী দিনে হবে। মহিলারা দিদির পক্ষেই রয়েছে। ” কিন্তু বিজেপির অভিযোগ, উন্নয়নের রেশমাত্র নেই।
এই জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের তরুণ, যুবকরা ওড়িশায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যায়। অনেকে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কেরালা, তামিলনাড়ুতে কাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে থাকছে। বছরের নির্দিষ্ট সময় তারা বাড়ি ফেরে। কটকে কাজ করতে যাওয়া এক যুবক বলে ফেলে, “এখানে কাজ থাকলে কি অন্য রাজ্যে যাওয়ার দরকার পড়ত?” কৃষক ধান কাটার দিনমজুরির জন্য পড়শি রাজ্যে চলে যায়।
জেলার একাধিক জায়গায় রাস্তাঘাট খারাপ। বহু জায়গায় সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। উন্নয়নের কাজ আরও প্রয়োজন, এমনই বলছেন জেলার মানুষজন। সবং এলাকায় উন্নয়নের কাজ সেভাবে হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে৷ যদিও তৃণমূলের দাবি, অনেকটাই হয়েছে, আরও হবে৷ রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুইয়া জানিয়েছেন, মানুষ সঙ্গে আছে। যদিও বিজেপির দাবি, মানুষকে বোকা বানাচ্ছে তৃণমূল। বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ দাবি করেছেন, উন্নয়ন কোথায় হয়েছে জানা নেই। মানুষকে তৃণমূল সরকার বোকা বানাচ্ছে।
জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। ঘাটাল মহকুমার মানুষজন প্রতি বছর বর্ষায় ভয় থাকেন। এবার কংসাবতী ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না তো? প্রতি বছর যেন নতুন করে সংসার পাতা, বাড়িঘর বানানো। সব কিছু গুছিয়ে ওঠার আগেই ফের বন্যার জল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। জলের সঙ্গে ভেসে যায় আশা, ভরসাও। এমনই বক্তব্য ঘাটালের বাসিন্দাদের। বন্যার জল নেমে গেলে কি জীবন ছন্দে ফিরে আসে? এখনও বহু পাকা বাড়ির দেওয়ালে জলের দাগ। বন্যার প্রভাব থেকে যায় বছরের পর বছর। এমনই বলছেন মানুষজন৷
সাংসদ দেব ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত করার কথা জানিয়েছেন। কাজ শুরু হয়েছে রাজ্য সরকারের হাত ধরে। কিন্তু কতদিনে হবে সেই কাজ? তৃণমূল সরকার ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত করবে বলে ঘোষণা করেছেন মমতা। সাংসদ দেব নিজে ভোটের প্রচারে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন। ঘাটালের রোড শো-তে মানুষজন কার্যত উপচে পড়েছিল। অভাব- অভিযোগের পরেও কি তাহলে শাসকদলের সঙ্গেই সাধারণ মানুষ রয়েছে? সেই প্রশ্ন থাকছে।
তবে বিজেপিও এই বিষয়ে প্রচার করছে। রাজ্য সরকারের জন্যই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে। গতবার হিরন চট্টোপাধ্যায় বিজেপির টিকিটে সেখানে জিতেছিলেন। তবে সেভাবে তিনি কাজ করেননি বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় বিয়ে করার পর তাঁকে নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয় এলাকায়।
একুশের নিরিকখে এই জেলার একটি মাত্র আসনে বিজেপি তাদের জয় ধরে রেখেছে। বাকি ১৫ টি আসনেই জোড়াফুলের পতাকা উড়ছে। এবার ভোটে কী হবে? জেলার বেশ কিছু আসন কি ছিনিয়ে নিতে পারবে বিজেপি? নাকি জয়ের ব্যবধান আরও বাড়াবে তৃণমূল? আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক শাসক দলের পক্ষে এত দিন থেকেছে। তবে হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের বেশিরভাগই ধীরে ধীরে বিজেপির দিকে। আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কে এবার গেরুয়া শিবির কতটা থাবা বসাতে পারে? সেই চর্চা চলছে।