• ভয়ের ভাঙড়ে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ শওকতের, গড়রক্ষা করতে পারবেন নওশাদ? কী বলছে ভোটঅঙ্ক?
    প্রতিদিন | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • বাংলার নির্বাচনে ভয়ভীতির পরিবেশ নতুন নয়। ভোটের দিন একটিও রাজনৈতিক সংঘর্ষ ঘটেনি, এমনটা বোধহয় কোনও নির্বাচনের কথা ইতিহাস লিখে যেতে পারবে না। বিগত কয়েক বছরে সেই ভয়ের বাতাবরণ আরও জোরালো হয়েছে। আর ভয় বলতেই অবধারিতভাবে মনে পড়ে ভাঙড়ের কথা। এই মুহুর্তে বিজেপি ছাড়া বঙ্গ রাজনৈতিক মানচিত্রে একমাত্র বিরোধী আসন এই ভাঙড়। অনেক সংঘর্ষ, অশান্তি, ক্ষমতার বাধা পেরিয়ে গত বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনটি দখল করেছিল রাজ্য রাজনীতিতে নবীন দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ। এখানকার তরুণ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। ছাব্বিশের ভোটেও তিনি প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের দাপুটে নেতা তথা অন্য কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক শওকত মোল্লা। এছাড়া এবার তাঁদের প্রতিযোগী আরেক নতুন দল, হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থীও। সবমিলিয়ে ভয়ের আবহেই জমজমাট লড়াই হতে চলেছে সেখানে। ছাব্বিশের নির্বাচনেও তাই রাজ্যের অন্যতম হটস্পট ভাঙড়।

    কলকাতা থেকে দক্ষিণ শহরতলির দিকে যেতে বাসন্তী হাইওয়ে দিয়ে এগোলে ভাঙড়। নামেই খানিক পরিচয় মেলে। ঘটকপুকুর পেরিয়ে ভাঙড়ে পা রাখামাত্রই ভয়ে বুক কেঁপে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কোনওদিকে বোমাবাজির চিহ্ন, কোথাও আবার ছড়িয়েছিটিয়ে বোমার স্প্লিন্টার। রাস্তায় হোক কিংবা বাড়িতে, উচ্চস্বরে কথা বলতে মানুষ ডরায়। কে কোথায় কাকে শত্রু ভেবে হামলা চালিয়ে দেবে, কে জানে! ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৭২ হাজার ৭১১। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলিম। মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ১৬, পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৬৮১, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৪। তবে ছাব্বিশের ভোটে এই সংখ্যায় কিছুটা হেরফের হয়েছে। এসআইআরের ফলে ভাঙড়ে মোট ২৯ হাজার ৮০৭ জনের নাম বাদ পড়েছে। তা নিয়ে এখানে ক্ষোভ কম নেই। ভোটে এটা একটা বড় ইস্যু হতে চলেছে।

    ভাঙড়ের নির্বাচনী যুদ্ধ বরাবর বেশ জমজমাট। ২০০৬ সালে সিপিএমের দাপুটে জমানাতেও তৃণমূলের ‘তাজা নেতা’ ভাঙড়ের লাল-দুর্গ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। ২০১১ সালে অবশ্য এই কেন্দ্রের দখল নেন সিপিএমের বাদল জমাদার। এরপর ২০১৬ সালে সিপিএম জমানার দাপুটে মন্ত্রী ‘চাষার ব্যাটা’ আবদুর রেজ্জাক মোল্লা তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন। পরেরবার ভাঙড়ে ফের বদল, তৃণমূলের বাঘা নেতা রেজাউল করিমকে পরাজিত করেন সদ্য নতুন দল আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি। তারপর থেকে নাকি ভাঙড় কিছুটা শান্ত হয়েছে! কতটা? তা অবশ্য বলতে পারবেন ভাঙড়বাসীই।

    ছাব্বিশের ভোটমুখী ভাঙড়ে মূল মাথাব্যথা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের অভাব। যদিও রাজ্য সরকার যথেষ্ট তৎপরতার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। বিশৃঙ্খল ভাঙড়কে শান্ত করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থানা ও পুলিশ কমিশনারেটের পরিধি বাড়িয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের পুনর্বিন্যাসে এখন ভাঙড়ের চারটি থানা কলকাতা পুলিশের আওতায়। তাতে স্থানীয় স্তরে অপরাধ কিছুটা কমলেও ভীতির পরিবেশ পুরোপুরি কেটে গিয়েছে, এমনটা কোনওভাবেই বলা যাচ্ছে না। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভাঙড়ে রাতের অন্ধকারে যথেষ্ট অশান্তির সাক্ষী স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘরে ঢুকে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। সেই আতঙ্কে এখনও কাঁটা ভাঙড়বাসী। বিদায়ী বিধায়ক তথা আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকি সরকারকেই দায়ী করেছেন। তাঁর সাফ অভিযোগ, সরকার চাইছে, তাই ভাঙড়ে হিংসা হচ্ছে।

    ঠিক উলটো কথা বলছেন তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লা। তাঁর অভিযোগ, ‘‘গত ৫ বছরের উনি (নওশাদ সিদ্দিকি) উন্নয়নে কী কাজ করেছেন, জানি না। তবে একটা বড় শিল্প গড়ে দিয়েছেন। ভাঙড়ের বাড়িতে বাড়িতে বোমা তৈরি হয়। গত ৫ বছরে ভাঙড় আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। উনি শুধু বড় বড় কথাই বলেন। আমি বলছি, অহংকারের পতন হবে। এখানকার মানুষ কোনও পরিষেবা পাননি গত ৫ বছরে। আমরা ক্ষমতায় এলে শুধু উন্নয়ন হবে।” এ শুধু শওকতের কথা নয়, দিন দুই আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাঙড়ে নির্বাচনী প্রচার করতে গিয়ে জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘‘আপনারা ভাঙড়ে শওকতকে জেতান, যা চাইবেন পাবেন।” অর্থাৎ গোটা রাজ্যের মতো ভাঙড়েও ব্যাপক উন্নয়ন চায় রাজ্য সরকার। বাধা শুধু এখানকার বিরোধী জনপ্রতিনিধি, এমনই ইঙ্গিত তৃণমূল সুপ্রিমোর কথায়।

    ভাঙড়ে এবার নওশাদ-শওকত লড়াই একেবারে সমানে সমানে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথাবার্তায় নানা ইঙ্গিত। কেউ চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন যজ্ঞে শামিল হতে, তাঁরা শওকতের পক্ষে। কারও আবার অগাধ আস্থা নওশাদে। তাঁদের দাবি, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নওশাদকে পাশে পেয়েছেন বিপদে-আপদে। সুযোগ পেলে নওশাদই তাঁদের জীবনযাত্রায় বদল ঘটাতে পারবেন। পাল্লা ভারী কার, সেই অঙ্ক অনেকটা সহজ হয়ে গেল ভাঙড়ের আরেক তৃণমূল নেতা কাইজার আহমেদের কথায়। তাঁর স্পষ্ট দাবি, ভাঙড়কে সংঘবদ্ধ করে তিনি ঘাসফুল শিবিরের একটা শক্তপোক্ত সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তারই শরিক ছিলেন আরাবুল। কিন্তু আড়াল থেকে শওকতের অঙ্গুলিহেলনে তাঁর সাজানো সংগঠন তছনছ হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ। তাঁর মনে হয়, এই কারণেই ভাঙড় জেতা তৃণমূলের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

    তৃণমূল-আইএসএফ দ্বিমুখী লড়াইয়ের মুখ্য হলেও গৌণ কিছু ফ্যাক্টরও রয়েছে। ভাঙড়ে কোনও সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি বিজেপি। দুর্বল সেই মাটিতেই পদ্মপ্রার্থী হয়ে লড়ছেন জয়ন্ত গায়েন। তাঁর মতে, ভাঙড়বাসী সিপিএম, তৃণমূল, আইএসএফের জনপ্রতিনিধিকে দেখে নিয়েছেন, এবার তাঁর বিজেপিকেই জয়ী করবেন নিজেদের সুরক্ষার কথা ভেবে। বিজেপি সরকার গড়লে অশান্ত ভাঙড় ঠান্ডা হয়ে যাবে বলে দাবি তাঁর। এছাড়া হুমায়ুনের পার্টি আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী সীমা ভট্টাচার্য লড়ছেন এই কেন্দ্রে এবং হাত শিবিরের প্রার্থী মাহবুবুল ইসলাম। এঁরা নিজেদের দলীয় লাইন মেনে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। জনমনে কে কতটা দাগ কাটতে পারবেন, সেই পরীক্ষা হবে আগামী ২৯ তারিখ। আর ৪ মে রেজাল্ট আউট।
  • Link to this news (প্রতিদিন)