• ‘পাণ্ডে লিগ্যাসি’ আর সংগঠনই পুঁজি শ্রেয়ার, কাকা-ভাইঝির লড়াইয়ে মানিকতলার ঘড়িতে বাজবে কার বিজয়ঘণ্টা?
    প্রতিদিন | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • সাধন পাণ্ডে। বঙ্গ রাজনীতির অজাতশত্রু। উত্তর ও মধ্য কলকাতার কংগ্রেসি ঘরানার রাজনীতিতে আলাদা লিগ্যাসি তৈরি করেছেন তিনি। সাধনের সেই লিগ্যাসিকে হাতিয়ার করেই এবার প্রথমবারের জন্য ভোট ময়দানে শ্রেয়া পাণ্ডে। সাধন পাণ্ডে বড়তলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ছ’বার এবং মানিকতলা কেন্দ্র থেকে তিনবারের জয়ী বিধায়ক। শেষবার জয়ের ব্যবধান ছিল ২০,২৩৮ ভোট। তাঁর মৃত্যুর পরে মানিকতলা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে স্ত্রী সুপ্তি পাণ্ডে জিতেছিলেন ৬২ হাজারের বেশি ভোটে। এবার সাধনের সেই লিগ্যাসিকে হাতিয়ার করে প্রথমবার বিধানসভায় যাওয়ার লক্ষ্যে নেমেছেন শ্রেয়া পাণ্ডে। প্রতিপক্ষ তাপস রায়।

    দীর্ঘদিন সাধন পাণ্ডে এবং তাপস রায় একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন। সে অর্থে দেখতে গেলে তাপস রায় সাধনের অনুগামীদের মধ্যে অন্যতম ও সফল। তাঁদের মধ্যে দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল। একসময় সাধনের বাড়িতে অবারিত যাতায়াত ছিল তাপসের। শ্রেয়া পাণ্ডেকে তিনি বড় হতে দেখেছেন। সুপ্তি পাণ্ডের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল তাপসের। কিন্তু রাজনীতির পথ আলাদা হতেই দূরত্ব বেড়েছে। তাপস রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছেড়ে বিজেপিতে যেতেই যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। তবে ভোটের প্রচারে দুই যুযুধান পক্ষ যথেষ্ট সৌজন্য দেখাচ্ছেন একে অপরকে। শ্রেয়া সাধনকে কাকু বলেই সম্বোধন করছেন। সাধনও ভাইঝির মতোই দেখেন শ্রেয়াকে। তবে রাজনীতির ময়দানে কেউই কারও জন্য জায়গা ছাড়তে রাজি নন। কাকা ভাইঝির বাইরে লড়াইয়ে আরও দু’জন রয়েছেন। সিপিআইয়ের মৌসুমি ঘোষ এবং কংগ্রেসের সুমন রায়চৌধুরী। 

    মোটামুটি উত্তর বা মধ্য কলকাতার আর পাঁচটা কেন্দ্রের মতো মানিকতলার মধ্যে একটা পুরনো কলকাতার মেজাজ রয়েছে। আবার পাল্লা দিয়ে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়াও। এখানে যেমন এক কামরার ঘিঞ্জি বাড়িতে গোটা পরিবারের বাস রয়েছে তেমনই বহুতলের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাসিন্দাও রয়েছেন। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত সবরকম মানুষের বাস। তথাকথিত বাঙালি ভদ্রলোকেরা যেমন এই কেন্দ্রে বাস করেন, তেমনই বহু অবাঙালি ভোটারেরও বাস। তবে এলাকার ৯৯.২ শতাংশ ভোটারই হিন্দু। সার্বিকভাবেই SIR-এও বিরাট প্রভাব পড়েছে মানিকতলায়। বাদ গিয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৩ ভোটারের নাম। তাঁদের মধ্যে মহিলা বেশি। বাবা-মায়ের নাম রয়েছে, মেয়ের নাম নেই। নানা জায়গায় এমন দৃষ্টান্ত। বাড়ির বড়দের অনেকের নাম নেই। বেশিরভাগই মহিলার নাম বাদ। প্রার্থীদের এই নিয়ে প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে। এসআইআরের আগে মানিকতলায় ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৮ হাজার ৭৯৯ জন। এখন সেটা কমে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ৯০৬। পুরুষ ও মহিলা ভোটের অনুপাত প্রায় সমান। এসআইআর নিয়ে অভিযোগ মানছেন বিজেপি প্রার্থী তাপস রায়ও। তিনি বলেন, “হ্যাঁ, সেটা ঠিক। কিন্তু মৃত ভোটারের ভোট নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ‌্যমন্ত্রী হবে? মানিকতলাতেও তাই। পুরসভা, বিধানসভা, লোকসভাতেও সেই ভোট পড়ত। আমি ২৪-এ হেরেছিলাম ৯২ হাজার ভোটে। ভোট লুঠ হয়েছে। তাতে মমতা নিজে মনিটর করেছিল। দুর্বৃত্ত, পুলিশ দিয়ে ভোট হয়েছিল।”

    এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ মানিকতলার ভোটের বড় ইস্যু। শাসকদল জনমানসের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চাইছে। বিজেপি আবার দাবি করছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে চোরাস্রোত কাজ করছে। সাধন পাণ্ডের লিগ্যাসি নিয়ে পাণ্ডে পরিবার পরপর দু’বার ভোটে লড়ছে। শ্রেয়ার লক্ষ্য এবার মায়ের ৬৩ হাজারের মার্জিন আরও বাড়ানো। শ্রেয়া যেখানেই যাচ্ছেন আগে বয়স্কদের সঙ্গে দেখা করছেন। কারও ভোট চাইছে না, শুধু কুশল জেনে আসছেন। শ্রেয়া যাকে বলছেন ‘রিকল ভ‌্যালু’। আসলে বাবা বিধায়ক থাকাকালীনই এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন তিনি। বাবার সঙ্গে বারবার গিয়েছেন মানুষের মধ্যে। তাই লোকে তাঁকে চেনে, দেখেই মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করছেন অনেকেই। তবে মধ‌্যবয়স্কদের নিয়ে কিছুটা ভাবনা রয়েছে। সাধনকে যাঁরা ভোট দিতেন, তাঁরা সুপ্তি পাণ্ডেকেও ভোট দিয়েছেন। কিন্তু শ্রেয়ার ব‌্যক্তিগত ইমেজ নিয়ে কিছু কিছু অভিযোগ রয়েছে। বিজেপি রীতিমতো সেটাকে প্রচারের হাতিয়ার করার চেষ্টা করছে। যদিও সাংগঠনিক দুর্বলতায় সেটা কতটা গতি পাবে তা নিয়ে দলের অন্দরেই সংশয় রয়েছে। কলকাতা পুরসভার ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ৩১ এবং ৩২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত মানিকতলা কেন্দ্র। সবকটি ওয়ার্ডই তৃণমূলের দখলে। তবে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির সংগঠন বাড়ছে। ৩১ নম্বর ওয়ার্ড পরেশ পালের ওয়ার্ডে বিজেপির চাপ বেড়েছে। পরেশ পাল অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিষেবায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে বলে অভিযোগ। ওই ওয়ার্ডে বিশেষ নজর দিচ্ছেন শ্রেয়া। তৃণমূল প্রার্থী মানছেন, ১০০ শতাংশ কাজ হয়নি। তবে তিনি দিনরাত এক করে মানুষের সব অভিযোগ দূর করতে চান। শ্রেয়ার কথায়, “যদি বলি ১০০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে, তাহলে মিথ‌্যা বলব। আমি চেষ্টা করব লাইট স্পিডে দিনরাত এক করে কাজ করার। তার জন‌্য অনেক কর্মী আমার দরকার, রাস্তায় তাদের নামাতে হবে। দায়িত্ববান লোক খুঁজে বের করতে হবে। শুধু কাজ নয়, তার রিপোর্টও দিতে হবে।” তৃণমূল প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি, “এক বছরের রিপোর্ট নয়। ৬ মাস পরপর প্রোগ্রেসিভ রিপোর্ট দেব লাইভ করে। ৫ বছরে ১০ বার রিপোর্ট দেব। কারণ দায়বদ্ধতা না থাকলে কাজ হবে না। ডোর টু ডোর গিয়ে যে সমস‌্যা শুনছি, জিতে এসে আবার সেখানে যাব। দেড় মাসে কাজ করব। কাজ হচ্ছে কিনা প্রতিশ্রুতি যা দিয়েছিলাম সেটা দেখব।”

    এলাকায় যে সব সমস্যা রয়েছে সেগুলির অন্যতম পার্কিংয়ের সমস‌্যা। অভিযোগ বড় বড় বহুতল হলেও পার্কিংয়ের সমস‌্যা মেটেনি। ফুটপাত দখল হয়ে গিয়েছে। পানীয় জলের গতি কম। তার জন‌্য অবিলম্বে দরকার বুস্টার পাম্পিং স্টেশন। রাস্তার কাজ, নিকাশির কাজ উল্টোডাঙার রাস্তায় সমস্যার। এলআইজি স্কিমে বিআরএস স্কিমে তৈরি হওয়া ফ্ল‌্যাটে বেশিরভাগ নিম্মবিত্তের বাস। সেসবের ভোট বাম, তৃণমূলে ভাগ হয়ে আছে। সদ্য লোকসভায় বাম ভোট বিজেপিতে গিয়েছিল। বামেরা সেই ভোট ফেরানোর চেষ্টা করছে। বসতি এবং নিম্নবিত্ত এলাকাগুলিতে শ্রেয়ার নিজের আলাদা জনসংযোগ রয়েছে। এলাকায় বেশ কিছু মন্দির নতুন করে গড়ে দেওয়া হয়েছে। সেসব থানে শ্রেয়ার অনুদান চলে। এছাড়া জগন্নাথ মন্দির তৈরি হয়েছে। সেটা নিয়েও আবেগ আছে। শ্রেয়া নিজে হেজুয়া বাসস্ট‌্যান্ড রাজবাড়ির দালানের মতো করে বানিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন সরকারের কাছে দাবি ছিল। কিন্তু সরকার না করায়, এই বাসস্ট‌্যান্ড শ্রেয়া নিজেই করে সরকারকে উপহার দিয়েছেন। আসলে কিছু অভিযোগ থাকলেও শ্রেয়াকে মানুষ সারা বছর নানাভাবে চোখে দেখতে পায়। সারা বছর ১২ মাসের ১৩ পার্বণ পালন করেন শ্রেয়া। নানা ইভেন্ট করে। ভজনের অনুষ্ঠানও করে, বড় বড় শিল্পী আনায়। তবে তাঁর বিধায়কের অভিজ্ঞতা নেই। সেটাকেই কাজে লাগাতে চাইছেন তাপস রায়। তাঁর বক্তব্য, “পাণ্ডে পরিবারের ভোট পাবে না, তৃণমূলের ভোট পাবে না। যদি নিজের হারের মার্জিনটা কমাতে পারে তাহলেই অনেক ভালো। এই নিয়ে আমি ১৪ বার নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছি। ও প্রথমবার। ওর বাবার সঙ্গে রাজনীতি করেছি, ছাত্র পরিষদ থেকে।” পালটা তৃণমূল কর্মীরাও বলছেন, শ্রেয়া নিজে বিধায়ক না হলেও বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সংগঠন আর জনসংযোগে তিনি বাকিদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে।

    এসবের মধ্যে কিছুটা ম্রিয়মান বাম ও কংগ্রেস। বাম প্রার্থী বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করছেন। সঙ্গে কিছু কর্মী-সমর্থক। কংগ্রেসের সুমন রায়চৌধুরীও তাই। গুটিকয়েক লোক নিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচার করছেন তিনিও। তাঁর আবার অভিযোগ, “তৃণমূল আর বিজেপি দুই প্রার্থীরই প্রচুর টাকা ছড়াচ্ছেন। তৃণমূলের প্রার্থীর মাসল পাওয়ারও আছে। আমাার লড়াই এদের দুইয়ের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ভোট করানোর দাবিতে। কারণ মানুষ বলছে মানিকতলার আমরা তো কংগ্রেসের পরিবার। দলের পতাকাটা দেখতে চাইছিলাম।” সিপিএমের লড়াইটাও তাই। প্রতীক বাঁচিয়ে রাখার।
  • Link to this news (প্রতিদিন)