• অবৈধ পাথর কারবার নিয়ে মুখে কুলুপ বিজেপি নেতাদের, থিতিয়ে গিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির সক্রিয়তাও সরব মমতাও
    বর্তমান | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বীরভূমের অবৈধ পাথর কারবার নিয়ে যে বিজেপি একসময় রোজ সরব হত, সেই পদ্ম শিবিরই এখন রহস্যজনকভাবে নীরব। এবার ভোটপ্রচারে বালি নিয়ে মাঝেমধ্যে সুর চড়ালেও পাথর নিয়ে কার্যত কোনো উচ্চবাচ্য নেই গেরুয়া শিবিরের নেতাদের। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, তবে কি ইডি ও সিবিআইয়ের সক্রিয়তা থিতিয়ে পড়ার নেপথ্যে কোনো গোপন সমঝোতা কাজ করছে? কোনো বিশেষ রহস্যে কি কেন্দ্রীয় এজেন্সির ফাইলও চাপা পড়ে গেল?

    বীরভূমে বৈধ খাদান মাত্র ছ’টি হলেও অবৈধ খাদানের সংখ্যা চারশোর বেশি। এই সাম্রাজ্যের অধিপতি জেলারই এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তিনিই এই কারবারের ‘মুকুটহীন সম্রাট’। কয়েকশো খাদানের অঘোষিত মালিক। তবে শুধু খাদান নয়, জেলার গুরুত্বপূর্ণ ডিসিআর টোল গেটগুলোরও নিয়ন্ত্রক এই ব্যবসায়ীই। অভিযোগ, প্রতিদিন টোলগেট ও ডিসিআর কাটার নামে যে নামমাত্র রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা মাঝপথে স্রেফ লুট হয়ে যায়। ২০২২সালে ওই ব্যবসায়ীর পেট্রল পাম্প ও অফিসে হানা দিয়েছিল ইডি। এমনকি খাদানে বিস্ফোরক ব্যবহারের অভিযোগে জেলায় এনআইএ হানা দিয়েছিল। কিন্তু তারপর সব থিতিয়ে গিয়েছে। যে বিজেপি নেতারা একসময় এই পাথর মাফিয়াদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেন তাঁরা এখন কেন মুখে কুলুপ এঁটেছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা।

    এবার নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী তালিকা সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। দল এমন কয়েকজনকে প্রার্থী করেছে, যাঁরা সরাসরি পাথর কারবারের সঙ্গে যুক্ত। সাঁইথিয়ার একদা গৃহশিক্ষক, বর্তমানে পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণকান্ত সাহা। বাবার চপের দোকান যাঁর পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস ছিল। সেই কৃষ্ণকান্ত বর্তমানে কোটিপতি। তাঁর এই উল্কাসম উত্থান নিয়ে জেলায় প্রচারে এসে তোপ দেগেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুর্নীতির ছায়া যে বিজেপির অন্দরে কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়েছিল ২০২৩ সালের আগস্টে। তৎকালীন জেলা সভাপতি ধ্রুব সাহা ও রাজ্য সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সিউড়ি জেলা পার্টি অফিসের সামনেই বিক্ষোভ দেখান দলের কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বালি ও পাথর পাচারের টাকা দলের চাঁদার নামে তুলে এইসব নেতারা আত্মসাৎ করছেন। 

    সোমবার মুরারইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনিয়ে সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, ‘এই বীরভূমের একজন নেতা লড়ছে। এই তিন-চার বছরে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি করেছে। তার কাছে কারা টাকা পাঠায় আমি জানি।’ বছরখানেক আগে প্রশাসনিক বৈঠকে এনিয়ে তত্কালীন জেলাশাসককে প্রকাশ্যেই ধমক দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘সরকারি রাজস্ব কেউ নিয়ে চলে যাবে আর তোমরা আঙুল গুটিয়ে বসে থাকবে এটা সহ্য করব না। আমাদের নেতারা এটা করছে না। ওখান থেকে সমস্ত বিজেপি ফান্ডে টাকা যাচ্ছে।’ অবৈধ কারবার রুখতে বারবার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু অভিযোগ, তারপরও মুখ্যমন্ত্রীর নজর এড়িয়েই রমরমিয়ে চলছে সেই কারবার। 

    নির্বাচনের মুখে বিজেপির তাবড় তাবড় নেতারা জেলায় প্রচারে এসেছেন। নানান ইস্যু নিয়ে মুখ খুললেও অবৈধ পাথরের কারবার নিয়ে মৌনব্রত নিয়েছেন সবাই। তবে কি মাফিয়াদের কাছ থেকে খাম পৌঁছে যাচ্ছে পদ্ম-শিবিরের ফান্ডে? বীরভূমের জনমানসে এখন এই প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিজেপির সহ সভাপতি দীপক দাস বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যজুড়ে সমস্ত অবৈধ বালি পাথর, কয়লার সিন্ডিকেট কারবার বন্ধ করবে। এই বার্তা দলের শীর্ষ নেতৃত্ব একাধিকবার দিয়েছে।
  • Link to this news (বর্তমান)