শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: ভোর হলেই কোলাহল শুরু হয়ে যায় সন্দেশখালিতে। ভেড়ির জলে জাল টানার তোড়জোড়, ধানের জমিতে কাজ শুরুর তাড়া, ঘাটে নৌকা ছাড়ার জন্য ডাকাডাকি—পূব আকাশ লাল হওয়ার আগেই জেগে ওঠে সন্দেশখালি। রায়মঙ্গল, বেতনি, ডাসা, কলাগাছির জলরেখা দিয়ে ঘেরা এলাকা। দুর্গামণ্ডপ, বেড়মজুর, রাজবাড়ি, সরবেড়িয়া, রামপুর, খুলনা, ধামাখালি, আকুঞ্জিপাড়া, তুষখালি—এমন ১৫টি পঞ্চায়েত এলাকাজুড়ে ব্যস্ত নদীবেষ্টিত জনপদ সন্দেশখালি। এর মধ্যেই চোখে পড়ছে বদলে যাওয়ার দৃশ্য! মাছের ভেড়ির পাশ দিয়ে গ্রামে ঢুকে গিয়েছে চকচকে পিচের রাস্তা। ধুলিয়া খালের উপর সেতুর পিলার উঠছে। যেখানে এতদিন ফেরিই ছিল পারাপারের একমাত্র ভরসা। প্রায় ৩ কোটি ৯১ লক্ষ টাকা খরচে নির্মিত হচ্ছে সেতুটি। এই উন্নয়নের কথাই ঘুরছে মানুষের মুখে মুখে। বেড়মজুরের তুফান মণ্ডলের কথায়, ‘আগে ধুলিয়া খাল পার হতে অনেক সময় লাগত। এখন আমাদের কষ্ট লাঘব হবে।’ স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও ইতিবাচক বদল লক্ষ্যণীয়। সন্দেশখালি গ্রামীণ হাসপাতাল ৩০ থেকে ৬০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। বরাদ্দ হয়েছে ৮ কোটি টাকা। খুলনার পার্বতী বাউড়ির কথায়, ‘আগে সাধারণ অসুখ হলেও চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হত। এখন নতুন করে আশার আলো দেখছি।’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথীর মতো প্রকল্প। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এগুলির প্রভাব স্পষ্ট। ধামাখালির মঞ্জু সর্দার বলেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা সংসারের কাজে লাগে। নিজেরও একটু ভরসা থাকে।’ এদিকে ২০২৪ সালে সন্দেশখালি আন্দোলনের পর জমি ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও এলাকায় চর্চা, জল্পনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই মানুষ প্রার্থীদের মধ্যে তুলনা টানছে। এখানে গৃহবধূ ঝর্ণা সর্দারকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তিনি উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সদস্যা। এখানে তাঁর পরিচয় ‘ঘরের মেয়ে’। বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন সনৎ সর্দার। পেশায় শিক্ষক। থাকেন বসিরহাটে। স্বভাবতই এলাকায় তাঁর যোগাযোগ কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজবাড়ির বাসিন্দা সুশীল মাইতি বলছিলেন, ‘বিজেপি প্রার্থী ভালো মানুষ। কিন্তু এখানে থাকেন না। সবসময় পাওয়া যাবে কি?’
২০২৪ সালে জমি আন্দোলন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছিল এখানেই। যাঁরা সেই সময় আন্দোলনের মুখ ছিলেন, তাঁদের একাংশ এখন ধীরে ধীরে তৃণমূলের দিকে ফিরছে। আদিবাসী আন্দোলনের কয়েকজন নেতার যোগদান সেই পরিবর্তনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সর্বোপরি বিজেপি নেতা গঙ্গাধর কয়ালের ভিডিও সামনে আসতেই বিজেপির ‘প্ল্যান’ ফাঁস হয় বলেই সোচ্চার হয়েছে তৃণমূল। ধামাখালির বাসস্ট্যান্ডের পাশে চায়ের দোকানে বসেছিলেন ইমতিয়াজ মল্লিক। তাঁর কথায়, ‘বিজেপি চক্রান্ত করে সন্দেশখালি সহ বাংলার মহিলাদের সম্মান নষ্ট করেছে । মানুষ তা বুঝতে পেরে তৃণমূলকেই বেছে নিয়েছে।’ ২০২৪-এর জানুয়ারি মাসের অশান্তি, নারী-নির্যাতনের অভিযোগ, বিজেপির ‘মহিলা দরদ’—সবই এখনও মনে আছে সন্দেশখালিবাসীর। এখন সেই আবেগের জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছে— তখন এত মহিলা নিয়ে কথা হল, এখন প্রার্থী কোথায়? নদীর জোয়ার সরে গেলে যেমন পাড়ে কাদা পড়ে থাকে, বিজেপির সেই আবেগও তেমনই—আছে, কিন্তু আর স্রোত তৈরি করছে না।’ সন্দেশখালির গ্রামগুলি তাই আগের মতো ব্যস্ত—কাজ, নৌকা, চাষজমি আর ভেড়ি নিয়ে। এই ব্যস্ততার মধ্যে রাজনৈতিক স্রোতের অভিমুখ যে তৃণমূলের দিকেই, সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ঝর্ণা সর্দারের সহজ, ঘরোয়া ইমেজ আর দৃশ্যমান উন্নয়নই এগিয়ে রাখছে জোড়াফুল শিবিরকে। ঝর্ণার দাবি, ‘বিজেপি সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছে সন্দেশখালি দখল করতে। কিন্তু মানুষ আমাকে ভরসা করছেন। আমাদের সরকারের উন্নয়ন আর বিজেপির চক্রান্ত মানুষ বুঝছে।’ বিজেপি প্রার্থী সনৎ সর্দার অবশ্য জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলছেন, ‘মানুষ তৃণমূলের অত্যাচারে জর্জরিত। কীভাবে মানুষের উপর নির্যাতন করা হয়েছে, তা দেশের মানুষ দেখেছে। আমাদের জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।’