নীতীশ চক্রবর্তী, খড়দহ: বেলা ১০টার খড়দহ স্টেশন রোড। চরম ব্যস্ততা চতুর্দিকে। স্কুলবাস, অটো, টোটো, মোটরবাইক, গাড়ি, ভ্যানের যেন স্রোত বইছে। রহড়া বাজার থেকে টোটোয় উঠে স্টেশন রোড ধরে বিটি রোড যেতে যেতেই কথা হচ্ছিল চালক রমেন বিশ্বাসের সঙ্গে। রেলগেট পড়তেই থমকাল টোটো। তখনই দু-এককথার পর প্রশ্নটা করেই ফেললাম চালককে। ভোটের হাওয়া কী বুঝছেন? একগাল হাসি নিয়ে বছর পঁয়তাল্লিশের রমেনের সটান উত্তর, ‘তৃণমূল জিতবে। এসআইআরে কীরকম হয়রানি হল বলুন তো! কাগজ বার করো, জেরক্স করো, লাইনে দাঁড়াও...। আতঙ্কে মানুষের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। তৃণমূল কিন্তু পাশে ছিল। আমার মনে হয় এবারও খড়দহ আরও একটা মন্ত্রী দিতে চলেছে রাজ্যবাসীকে।’ পাশে বসা সহযাত্রী বলে উঠলেন, ‘এসআইআর কিন্তু বিজেপির জন্য বুমেরাং হয়ে যেতে পারে।’ জানতে চাইলাম, ময়দানে তো বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেসও রয়েছে নাকি? এবারও যেন উত্তরটা ঠোঁটের ডগায় ঝুলিয়েই রেখেছিলেন রমেন। অস্ফুটে বললেন, দাদা! আমরা দিন-রাত রাস্তায় ঘুরছি। কাউকে তো সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না।’
হাইপ্রোফাইল বিধানসভা কেন্দ্র খড়দহ। নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রাসাদ বিদ্যাবিনোদের জন্মভূমি এবং রবি ঠাকুরের স্মৃতিধন্য এই জনপদ রাজ্যকে দু’জন অর্থমন্ত্রী দিয়েছে। বাম আমলের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত থেকে তৃণমূল আমলের অমিত মিত্র কিংবা বিদায়ী বিধায়ক তথা মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়— একাধিক ‘তারকা’ নেতা এই কেন্দ্র থেকে জিতেই বিধানসভায় গিয়েছেন। এবার আরও একবার বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে সেই খড়দহে। শাসক শিবির তৃণমূল এবারও প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। অন্যদিকে, মরিয়া প্রতিপক্ষ বিজেপি তুলছে বেকারত্ব-দুর্নীতি-অনুপ্রবেশের ইস্যু। লড়াইয়ে রয়েছে বামফ্রন্টও। তারাও তাদের চিরাচরিত—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো সংস্কারের বুলি আউড়ে প্রচার চালাচ্ছে।
২২টি ওয়ার্ডের খড়দহ পুরসভা এবং চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত (বিলকান্দা ১ ও ২, বন্দিপুর এবং পাতুলিয়া) মিলিয়ে খড়দহ বিধানসভা এলাকা। একপ্রান্তে গঙ্গা, বিটি রোড ও খড়দহ রেল স্টেশন এবং অন্যদিকে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। ১৯৬৭ সাল থেকে খড়দহ সিপিএমের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০০৬ সাল পর্যন্ত (১৯৭২ বাদে) এই আসন দখলে রেখেছিল সিপিএম। টানা পাঁচবার খড়দহ থেকে জয়ী হন সিপিএমের অসীম দাশগুপ্ত। ২০১১ সালে পালাবদল ঘটিয়ে বিপুল মার্জিনে জেতেন তৃণমূল কংগ্রেসের অমিত মিত্র। তারপর কাজল সিনহা থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়—প্রার্থীরা বদলে-বদলে গেলেও খড়দহে তৃণমূলের সেই জয়ের ট্র্যাডিশন কিন্তু অব্যাহত থেকেছে। এবার তৃণমূল খড়দহে প্রার্থী করেছে প্রাক্তন সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিতকে। আর বিজেপির বাজি কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক কল্যাণ চক্রবর্তী। দুজনের মধ্যে মিল আছে, আবার অমিলও। দুজনেই উচ্চশিক্ষিত, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী। কিন্তু, রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভাবে দুজন দুই পথের পথিক। সদ্য সূর্য সেন নগরের মাঠে দেবদীপের সমর্থনে প্রচার সভা করে গিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেটা যে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, তা একবাক্যে স্বীকার করলেন তৃণমূল প্রার্থী। দেবদীপের কথায়, ‘তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষ দেখেছেন। প্রচার-জনসংযোগে আমরা অনেক এগিয়ে। সর্বত্র বিপুল সমর্থন পাচ্ছি। সেই তুলনায় আমার প্রতিপক্ষদের কর্মসূচিতে মুষ্টিমেয় লোক হচ্ছে। যা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট, এবারও খড়দহে জোড়াফুলই ফুটবে।’
বিজেপি প্রার্থী কল্যাণ চক্রবর্তী অবশ্য এসব মানতে নারাজ। তাঁর কথায়, ‘সাংস্কৃতিক দিক থেকে খড়দহ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাছাড়া রাজনীতির আঙিনাতেও খড়দহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কেন্দ্রকে মন্ত্রী তৈরির কারখানা বলতে পারেন। কিন্তু, সেই খড়দহের মানুষই বরাবর উপেক্ষিত থেকেছেন। বাম বা তৃণমূল কোনো জমানাতেই এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন হয়নি। তাই এবার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। এই বিধানসভা এলাকার মধ্যে কৃষি ও শিল্প দুটোরই প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। আমি এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ব্যবস্থা করব।’ সিপিএম প্রার্থী দেবজ্যোতি দাস তাঁর প্রচারে পানীয় জল, স্টেশন রোডের যানজট মেটাতে উড়ালপুলের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সিপিএম প্রার্থীর কথায়, ‘২০০৮ সালে বাম আমলে উড়ালপুলের জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই কাজ তৃণমূল আটকে দেয়। আমি ভোটে জিতলে দ্রুত উড়ালপুলের কাজ শুরু করব। পরিস্রুত পানীয় জলের অভাবে খড়দহে ডায়ারিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। সেই সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগী হব।’
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে খড়দহ পুরসভার ৯টি ওয়ার্ড ও একটি পঞ্চায়েতে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে কিছুটা পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। এবার সেই ঘাটতিটুকুও কি পূরণ হয়ে যাবে? উত্তর মিলবে ৪ মে। ফাইল চিত্র