সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল চক্রবর্তী, শ্যামল সেন: বারাকপুর, কলকাতা ও হলদিয়া: বাংলায় প্রথম দফার ভোট প্রচার শেষ। আর সেই সমাপ্তি চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৫২টি আসনের প্রত্যেক ভোটারের উদ্দেশে বার্তা পৌঁছে দিলেন তিনি—যাঁরা আপনাদের লাইনে দাঁড় করিয়েছে, হয়রান করেছে, তাঁদের জবাব দিন। বাংলার বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী বিজেপিকে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে বেলাইন করে দিন।
অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন, হয়রানি—গত বছরের নভেম্বর থেকে এই শব্দগুলি কার্যত ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে বাংলার ১৮ থেকে ৮০ বছরের জনতাকে। অপরিকল্পিত এসআইআরে ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জন্য বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছে তৃণমূল। ইনিউমারেশন ফর্ম জমা দেওয়া থেকে ট্রাইবুনাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে যারা লাইনে দাঁড় করিয়েছে, তাদের এবার জবাব দেওয়ার পালা বলে সোচ্চার হয়েছে তৃণমূল। মঙ্গলবার, প্রচারের শেষ দিনে একাধিক জনসভা থেকে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদন, ‘যে বিজেপি অত্যাচার করেছে, সাধারণ মানুষের চোখের জল ফেলেছে, মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে এবার গণতান্ত্রিভাবে বদলা নেওয়ার সময়। সাধারণ মানুষকে বলছি, নিজের ভোট নিজে দিন। আর বিজেপিকে যোগ্য জবাব দিন। সূর্যোদয় থাকলে সূর্যাস্তও আছে। বিজেপির সূর্যাস্তের সময় এসে গিয়েছে। এবার হবে বিজেপি পগারপার।’
বিধানসভা ভোটে নিরঙ্কুশ জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল শিবির। এই প্রত্যয়ের কারণ কী? তৃণমূল মনে করছে, যে কেন্দ্রগুলিতে প্রথম দফায় ভোট হচ্ছে, সেখানে গত এক মাসে তৃণমূল প্রার্থীদের প্রচারে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়াই বিজেপির পতনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। মঙ্গলবার দিনভর মমতার কর্মসূচিতেও তারই প্রতিফলন। এদিন হলদিয়া, বারাকপুর, জগদ্দল ও জোঁড়াসাঁকো কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে জনসভা করেন মমতা। সভাগুলিতে তিনি বলেন, ‘বিজেপির পতন অনিবার্য। আমরাই সরকার গড়ছি। সাধারণ মানুষকে বলব, একটি ভোটও বিজেপিকে দেবেন না। নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে তৃণমূলের হাত শক্ত করুন। কে প্রার্থী ভুলে যান, সব কেন্দ্রে আমি প্রার্থী। আমার নেতৃত্বে সরকার চাইলে সব আসনে আমাকে দেখে ভোট দিন।’ কেন তৃণমূলকে ভোট দেবেন? মমতা বলেন, ‘তৃণমূল থাকলে সারাজীবন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাবেন। বার্ধক্য ভাতা পাবেন। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সবার উন্নয়ন হবে। কর্মসংস্থানে বাংলা এগিয়ে যাবে। আর বিজেপিকে ভোট দিলে দুর্ভোগ বাড়বে।’
বস্তুত, এবার ভোটের অনেক আগে থেকেই বাংলা দখলকে ‘পাখির চোখ’ করে হাজারো কৌশলের আমদানি করেছে গেরুয়া শিবির। সব কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে, লক্ষাধিক কেন্দ্রীয় বাহিনী, সাঁজোয়া গাড়ি এনে বিজেপি বাংলা দখলের ‘ছক’ করছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। এই ‘ছক’ ব্যর্থ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তৃণমূল নেত্রী। তাই তাঁর বার্তা, ‘বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না। এই খেলায় বিজেপিকে পগারপার করে দেব। এটাই হবে বাংলার উপহার। আমি করব, লড়ব এবং জিতব। এরপর আমার টার্গেট দিল্লি। জোট করে দিল্লি থেকেও বিজেপিকে তাড়াব।’ তবে তৃণমূল কর্মীদের সদা সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। বলেন, ‘ইভিএম খারাপ হলে ভোট করাবেন না। ওখানে চিপ ঢুকিয়ে বিজেপির পক্ষে ভোট করিয়ে নেবে। রাত হয়ে গেলেও লাইনে থাকতে হবে। না হলে বাইরের লোক এসে ভোট দিয়ে চলে যাবে। গণনার সময় সব কম্পিউটারের নম্বর লোড করে ছবি তুলে নিয়ে তারপর বেরবেন। কারণ ওরা তৃণমূলের ভোট ৫০০ করে কমিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে।’