• বাইক ‘নিষিদ্ধ’! প্রবল চাপে ব্যাকফুটে কমিশন, ডেলিভারি কর্মী, অ্যাপ বাইকে শুধু ছাড়, বাংলার আম জনতার কপালে হয়রানিই
    বর্তমান | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বেনজির বললেও কম! তুঘলকিও শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে এবার আম জনতার সওয়ারি মোটর বাইকের উপর কোপ পড়ল কমিশনের। সোমবার রাতে বিজ্ঞপ্তি জারি করে তাদের হুকুমনামা ছিল, ভোটের দু’দিন আগে থেকেই বাইক ‘নিষিদ্ধ’। ছাড় শুধু মেডিকেল ইমার্জেন্সি এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে। মঙ্গলবার সকালে এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসা মাত্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে বাংলার আনাচে কানাচে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের সহজ যাতায়াত, এমনকি রুজিরুটির জন্যও দু’চাকার যান ব্যবহার করে থাকেন। তিনদিন বাইক বা স্কুটার নিয়ে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেলে তার গুণাগার কে ভরবে? কমিশন তো নয়? এই প্রশ্নে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বাংলার মানুষ। কমিশনের যুক্তি ছিল, ভোটে অশান্তি ঠেকানোর জন্য বাইক মিছিল বন্ধে এই নির্দেশনামা। কিন্তু তাতে চিঁড়ে গলেনি। উলটে, সাধারণ মানুষকে ‘দুষ্কৃতী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার মতো নির্দেশিকায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে জনতা। আর তাতেই চাপে পড়ে মঙ্গলবার বিকেলে পিছু হটতে হয় কমিশনকে। অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি পরিষেবা এবং অ্যাপ ক্যাবগুলিকে ছাড় দেওয়া হয় এই ‘ফতোয়া’ থেকে। কিন্তু তারপরও যে লক্ষ লক্ষ বাইক-স্কুটার ব্যবহারকারী এর বাইরে থেকে গেলেন, তাঁদের বিষয়ে একটি শব্দও খরচ করেনি কমিশন। উলটে, এবার ভোটে দ্রুত ‘অশান্তিপ্রবণ’ অলিগলিতে পৌঁছাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও বাইকে চাপানোর সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আর সেজন্য আগামী ক’দিন ব্যাপক হারে বাইক ধড়পাকড় শুরু হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। 

    সোমবার অর্থাৎ ২০ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তি জারি করে কমিশন জানায়, ভোটের দু’দিন আগে থেকে বাইক মিছিল করা যাবে না। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইক চালানো যাবে না। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাইক চালানো যাবে ঠিকই, কিন্তু বাইকের পিছনে যাত্রী বসতে পারবেন না। নির্বাচনের দিন বাইক চালানোর ক্ষেত্রে কী শর্ত? ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে বা জরুরি কোনো কাজে বাইক নিয়ে বেরোলে তবেই এই ছাড় মিলবে। জরুরি প্রয়োজন হিসাবে বিজ্ঞপ্তিতে চিকিৎসা, পারিবারিক কাজ কিংবা স্কুলে শিশুদের নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য যাঁরা বাইকে সওয়ার হবেন, তাঁদেরও ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়। এর বাইরে কেউ বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেতে চাইলে, তাঁকে স্থানীয় থানা থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। এই বিধিনিষেধ যাতে লঙ্ঘিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে জেলাগুলিকে নির্দেশও দিয়েছে কমিশন। এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মোটর বাইক চলবে না, এমন নির্দেশ দিয়েছে। তাহলে সাধারণ মানুষ ঘরে ফিরবেন কীভাবে? প্রচুর মানুষ আছেন যারা দূরদূরান্ত থেকে কাজে আসেন। তাঁদের কাছে বাইকই একমাত্র ভরসা। তাহলে তাঁরা কাজেই বা আসবেন কীভাবে? এটা তো একপ্রকার বদমায়েশি। এই শয়তানি যারা করেছে, জোরজুলুম চালাচ্ছে, মানুষকে বলব তাদের ভোটের বাক্সে গণতান্ত্রিকভাবে জবাব দিতে।’

    আম জনতার গলাতেও ছিল এই ক্ষোভেরই রেশ। বাগুইআটির সঞ্জয় বিশ্বাস সল্টলেক সেক্টর ফাইভে একটি বেসরকারি আইটি সংস্থায় কাজ করেন। রোজ নিজের বাইকে কর্মস্থলে যাতায়াতেই অভ্যস্ত। তাঁর ক্ষোভের বিস্ফোরণ, ‘রাজ্যে কি রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে নাকি? যা খুশি তাই বললেই হল? বাইক আমার। তেলও নিজের পয়সায় কিনি। রোড ট্যাক্সও দিই। তাহলে কেন ভোটের দু’দিন আগে বাইক চালাতে পারব না। এসব হচ্ছেটা কী? কমিশন চাইছে কী?’ শুধু সঞ্জয় নন, তাঁর মতো লক্ষ-কোটি মানুষ নিত্যদিন বাইকে নির্ভরশীল। শুধুমাত্র কলকাতাতেই নথিভুক্ত বাইকের সংখ্যা ১৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৬৫৪। জেলাগুলির হিসাব কষলে সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়।  

    আর সেকারণেই শেষে সিইও মনোজ আগরওয়াল বলেন, ‘বিষয়টি যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। বাইক চলছে, বাইক চলবে। তবে দল বেঁধে বাইক নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি চলবে না। সেকারণে কিছু বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছে।’ তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে মনোজের সংযোজন, ‘এবার ভোটের কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকরা বাইক ব্যবহার করবে। সেজন্য বাইকের প্রয়োজন হবে। ইতিমধ্যেই জেলাগুলিকে রিকুইজিশন করতে বলা হয়েছে। যাদের বাইক নেওয়া হবে, নিয়ম মতো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’ আর র‌্যাপিডো, জোমাটোর মত অ্যাপনির্ভর বাইক সংস্থার কর্মীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওই সমস্ত সংস্থার কর্মীরা বাইক নিয়ে বেরোলে সঙ্গে পরিচয়পত্র রাখতে হবে।
  • Link to this news (বর্তমান)