• ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ২ বিজয়ের, তাল ঠুকছে রবি ঠাকুরের পাড়া
    বর্তমান | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • অর্ক দে, কলকাতা: পোস্তা বাজারে ঘনশ্যাম সাউয়ের চায়ের দোকানে গরম জলে চা পাতা ফুটছে টগবগ করে। দোকানের সামনে বসে আছেন কয়েকজন। কাজের ফাঁকে চলছে চা সহযোগে আড্ডা। কিছুক্ষণ আগে এই পথ ধরে প্রচার করে গিয়েছেন জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী বিজয় উপাধ্যায়। দু’দিন আগে এই অঞ্চলে প্রচার করেছেন বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝা। টগবগে চায়ের জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনীতির উত্তাপ! কোন বিজয় জিতবে? কার পাল্লা ভারী? প্রসঙ্গ পাড়তেই এক ফল ব্যবসায়ী হিন্দিতে যা বললেন, তার বাংলায় তরজমা করলে দাঁড়ায়, ‘ওঁরা দুজনেই তো আমাদের ঘরের লোক।’ অর্থাৎ, দুই বিজয়কে নিয়ে কিছুটা হলেও দ্বিধান্বিত জোড়াসাঁকো। যদিও ধারে-ভারে তৃণমূল প্রার্থীই যে এগিয়ে রয়েছেন, মানছেন অনেকেই। বিজয় উপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে অনেকের উপকার করেছেন বলে একজন দাবি করায় বাকিরা তাতে সম্মতি জানালেন। তবে বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝাও অনেকের ‘মুশকিল আসান’। এক দোকানদারের কথায়, ‘বিজয় ওঝা স্থানীয় কাউন্সিলার। সব সময় মানুষের পাশে থাকেন। কাজের লোক।’ দুই বিজয়ের লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবে তেমন কোনো ছাপ ফেলতে পারছেন না এই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী ভরতরাম তিওয়ারি বা কংগ্রেসের দীপক সিং। 

    এক সময়ের কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি করেছেন বর্ষীয়ান নেতা বিজয় উপাধ্যায়। তবে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কলকাতা পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূলের কাউন্সিলার তিনি। যদিও ওই ওয়ার্ড শ্যামপুকুর বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তিনি জোড়াসাঁকোর ভূমিপুত্র। অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী বিজয় ওঝা পাঁচপুরুষ ধরে জোড়াসাঁকোরই বাসিন্দা। তাই লড়াই এবার টানটান।

    এই বিধানসভা একসময় কংগ্রেসের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। এই আসনে ১১ বার জয়লাভ করেছে তারা। ফরওয়ার্ড ব্লক এবং জনতা পার্টি যথাক্রমে ১৯৫২ এবং ১৯৭৭ সালে একবার করে জয় পেয়েছিল। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। ২০০১ সাল থেকে জোড়াসাঁকোয় টানা পাঁচটি নির্বাচনে জিতেছে তৃণমূল। পুরসভার ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্র বাঙালির ইতিহাস এবং সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান এখানেই। এই অঞ্চল বাংলার নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্রও বটে। কালীপ্রসন্ন সিংহ এবং কৃষ্ণদাস পালের মতো ব্যক্তিরা এখানে কাজকর্ম করেছেন। আদি ব্রাহ্মসমাজ এবং ওরিয়েন্টাল সেমিনারির মতো প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধ করেছে জোড়াসাঁকোকে। সেই কেন্দ্রেই এখন বাঙালিই সংখ্যালঘু! সেই সূত্রেই গত কয়েক বছরে এখানে বিজেপির পালে হাওয়া লেগেছে বলে মনে করে রাজনৈতিক মহল। আগে বাঙালি স্মিতা বক্সি এখানকার তৃণমূল বিধায়ক হলেও ২১-এ এখানে অবাঙালি প্রার্থী দেয় তৃণমূলও। বিজেপির মীনাদেবী পুরোহিতকে হারান জোড়াফুলের বিবেক গুপ্তা। তবে লোকসভা নির্বাচনে ছবিটা বদলে যায় বারবার। গত তিনটি লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূল বিজেপির চেয়ে পিছিয়ে থেকেছে। ২০১৪ সালে সেই ব্যবধান ছিল ১৬,৪৮২। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩,৮৮২। কিন্তু ২০২৪ সালে তা আবার বেড়ে হয় ৭,৪০১।  রবীন্দ্র সরণি (চিৎপুর রোড) বরাবর বিস্তৃত জোড়াসাঁকো কেন্দ্র কলকাতার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক অঞ্চল। জনবহুল এলাকা। প্রাচীন বাড়ি, সরু গলির মধ্যে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় পুরানো কলকাতাকে। বড়বাজার, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ এবং কলেজ স্ট্রিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে। টানা পাঁচবার জয়ী হওয়া সত্ত্বেও ঘাসফুল শিবির এই কেন্দ্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল গত লোকসভায়। সেই কারণেই এবার মমতার ‘তুরুপের তাস’ বিজয় উপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই আসন উপহার দেব।’ বিজেপি প্রার্থী বলছেন, ‘আমার কলকাতায় জন্ম। পুরোদস্তুর বাঙালি বলতে পারেন।’ রবি ঠাকুরের পাড়ায় তাঁর এই ‘বাঙালিয়ানা’ যে প্রচারের  অন্যতম হাতিয়ার, মানছেন বিজয়। তাঁর কথায়, ‘সবাইকে একটা কথাই বলছি, আমি শাসক নই, সেবক। বিধায়ককে খুঁজে বার করতে হবে, এমনটা কোনো দিন হবে না। মানুষের কাছে থাকব, কাজে থাকব।’-নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)