এই সময়: ‘মানবতার সীমারেখা অতিক্রম করলে, প্রত্যুত্তর হয় সিদ্ধান্তমূলক। ন্যায়বিচার হয়েছে। ভারত ঐক্যবদ্ধ। কিছু সীমা কখনওই অতিক্রম করা উচিত নয়। ভারত কিছু ভোলে না।’
আজ, বুধবার পহেলগাম হামলার বর্ষপূর্তির ঠিক আগে মঙ্গলবার সেনাবাহিনীর তরফে এই বার্তা দেওয়া হয় দেশবাসীর উদ্দেশে। ধর্ম জিজ্ঞেস করে, বেছে বেছে নিরীহ পর্যটকদের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে পহেলগামের বৈসরন ভ্যালি রক্তাক্ত করেছিল লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গিরা। দেশবাসীর ধমনীতে ভয়ঙ্কর রাগের যে স্রোত ছুটতে শুরু করেছিল, দু’ধাপে তার বদলা নিয়েছে ভারত। প্রথমে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পর্যায়ক্রমে পাকিস্তানের একাধিক জঙ্গি শিবির এবং বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংস এবং পরে ‘অপারেশন মহাদেব’-এ বৈসরনের তিন জঙ্গি সুলেমান শাহ, হামজ়া আফগানি এবং জ়িবরানকে নিকেশ করা হয়। ক্ষোভের ক্ষতে হয়তো তাতে খানিকটা মলম পড়েছে, কিন্তু মনের ক্ষত? একটা বছর পেরিয়ে কেমন আছে প্রিয়জন হারানো সেই পরিবারগুলি? কেমনই বা আছে বৈসরন ভ্যালি?
মেঘে ঢাকা পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে বৈসরনের সবুজ গালিচায় স্বামীর নিথর দেহের সামনে বসা তরুণীর ছবি দেখে শোকে, রাগে কেঁপে উঠেছিল দেশ। নিহত নেভি অফিসার বিনয় নারওয়ালের সদ্যবিবাহিতা সেই স্ত্রী হিমাংশী সব হারিয়েও আর্জি করেছিলেন, ‘মুসলিম এবং কাশ্মীরিদের টার্গেট করবেন না। লড়াইটা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে, ওঁদের বিরুদ্ধে নয়।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় এ জন্য গত এক বছর ধরে বিদ্ধ হতে হয়েছে তাঁকে। তিনি রয়ে গিয়েছেন আড়ালেই। আর বিনয়ের বাবা রাজেশ আক্ষেপ করে চলেছেন, ‘কেন যে অল্প বয়সে জোর করে ওকে বিয়ে দিলাম। মেয়েটাও তো…’
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার অফিসার, পুরুলিয়ার ঝালদার মণীশরঞ্জন মিশ্রের শরীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল জঙ্গিদের স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। তাঁর স্ত্রী জয়া এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। মণীশের ভাই বিনীত জানিয়েছেন, দুই সন্তানকে নিয়ে জয়া মূলত এলাহাবাদে তাঁর বাপের বাড়িতে থাকেন। মাঝেমধ্যে ঝালদায় আসেন। বিনীত বলেন, ‘বৌদি এখনও অস্বাভাবিক আচরণ করেন কখনও কখনও। এই সে দিনই সংজ্ঞাহীন হয়ে গিয়েছিলেন। দাদা খুব ভালো গান গাইতেন। মোবাইলে রেকর্ড করা গানগুলো চুপচাপ বসে শোনেন মা।’
পুনের আশাবরীর চোখের সামনে লুটিয়ে পড়েছিল বাবা সন্তোষ জাগদালের দেহ। বলছেন, ‘ভুলতে পারব না কোনও দিন। গত একটা বছর যেন নরকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’ আর এক নিহত পর্যটক প্রশান্তকুমার শতপথীর স্ত্রী প্রিয়দর্শিনীর গলা বুজে আসে — ‘সবাই বলে, লাইফ গোজ় অন। আমার জীবন ওই দিনটায় থমকে গিয়েছে।’ সাড়ে চার বছরের ছেলেকে কী করে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখবেন, ভেবে পাচ্ছেন না বেঙ্গালুরুর চিকিৎসক সুজাতা। একরত্তির সামনে তাঁর স্বামী ভরত ভূষণকে গুলি করেছিল জঙ্গিরা। সুজাতা বলছেন, ‘ও এখনও বলে, পাপার খুব কষ্ট হচ্ছে মাম্মা। কত রক্ত!’ বায়ুসেনার কর্পোরাল পদে কর্মরত ছিলেন তাগে হেলইয়াং। জঙ্গির বুলেটে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়েছিল তাঁর বুকও। তাঁর স্মৃতিতে একটি স্মারক তৈরি করেছে পরিবার।
সেই রক্তাক্ত ২২ এপ্রিলের ভয় সরিয়ে, নরমেধের যন্ত্রণা বুকে নিয়েই পহেলগামে আবার ফিরতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। নিহত ২৬ জনের স্মৃতিতে বৈসরনে তৈরি হয়েছে সৌধ। কড়া নিরাপত্তায় মোড়া থাকছে বৈসরন। ট্যুরিজ়ম সার্ভিস প্রোভাইডারদের জন্য তৈরি হয়েছে বার কোড, যা নিয়মিত পুলিশের স্ক্যানারে থাকছে। সব তথ্য সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাচ্ছে পুলিশ।