• গনিখানের হাতেই মালদার ক্ষমতার চাবিকাঠি
    এই সময় | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • মালদা

    তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত কেন্দ্রে গত বিধানসভায় বিজেপির গোপালচন্দ্র সাহা জেতেন ১৫৪৫৬ ভোটে। তিনি ফের প্রার্থী। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির 'লিড' বেড়ে হয় ৬৩ হাজার। পদ্মের প্রতিদ্বন্দ্বী মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি, তৃণমূলের লিপিকা বর্মন ঘোষ। এখানে মোট ভোটার ছিলেন ২৩১৩৪৮। 'সার'-এর কারণে ১৬২৬২ জনের নাম বাদ গিয়েছে। এই কেন্দ্রে ফ্যাক্টর হতে পারেন কংগ্রেস প্রার্থী অর্জুন হালদার। অতীতে তিনি এখানকার বিধায়ক ছিলেন। অর্জুন যদি গোপালের ভোটে ভাগ বসাতে পারেন, তা হলে লড়াই জমে যাবে।

    ইংরেজবাজার

    এই কেন্দ্রে চতুর্মুখী লড়াই। টক্কর তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে। ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ২৩৯৫৩ জনের নাম। গতবার বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ২০ হাজার। বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়ী পেশায় আইনজীবী। তৃণমূল প্রার্থী হয়েছেন আশিস কুণ্ডু। পেশায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। চার বারের কাউন্সিলার। সিপিএম প্রার্থী অম্বর মিত্র পার্টির হোলটাইমার। বাম-কংগ্রেসের প্রার্থীরা থাকলেও লড়াই মূলত বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে।

    হরিশ্চন্দ্রপুর

    এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী তাজমুল হোসেনকে অবসরে পাঠিয়ে তৃণমূল নতুন মুখ এনেছে। এখানে কিন্তু ঘাসফুলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের একদা জোটসঙ্গী কংগ্রেস। দুই কংগ্রেসের লড়াইয়ে তাল ঠুকছে বিজেপি। গত নির্বাচনে তৃণমূল জয়লাভ করেছিল ৭৭৪৭৩ ভোটে। 'সার'-এর ইস্যুতে নাম বাদ গিয়েছে ১৭৫৮৭ জনের। তৃণমূল প্রার্থী মতিবুর রহমান নামকরা শিল্পপতি। কংগ্রেস প্রার্থী মোস্তাক আলম এই কেন্দ্রেরই প্রাক্তন বিধায়ক। আরএসএস কর্মী রতন দাস বিজেপি প্রার্থী। টিকিট না পেয়ে পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটাচ্ছেন তাজমুল। যা কি না রক্তচাপ বাড়াচ্ছে তৃণমূল প্রার্থীর।

    মানিকচক

    অসুস্থতার কারণে নিজের খাসতালুকে এ বার প্রার্থী হতে পারেননি সাবিত্রী মিত্র। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৩৩৮৭৮। 'সার'-এ নাম বাদ গিয়েছে মাত্র ১৬৫৯ জনের। তাই এই কেন্দ্রে 'সার' কোনও ইস্যু নয়। এ বারের তৃণমূল প্রার্থী কবিতা মণ্ডল। উল্টোদিকে রয়েছেন একদা মালদা জেলা পরিষদের সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল। ফুল বদল করে তিনি এখন বিজেপি প্রার্থী। দুই প্রার্থীর মাঝে হাইফেন হয়ে রয়েছেন সিপিএমের দেবজ্যোতি সিনহা। তিনি কার কতটা ভোট কাটতে পারবেন, সেটাই দেখার।

    রতুয়া

    এই কেন্দ্রের পাঁচ বারের বিধায়ক অশীতিপর সমর মুখোপাধ্যায় এ বারও ভোটের ময়দানে। তিনিই সম্ভবত এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী। এখানে তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে মূল লড়াই। তবে রতুয়ায় কংগ্রেস প্রার্থী মুত্তাকিন আলমকে উপেক্ষা করলে ভুল হবে। তিনিও ফ্যাক্টর। ভোটার তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে ২০ হাজার ৭৩৮ জনের। গতবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৭৫ হাজার ৬৫০। এই বিশাল ব্যবধানকে ছাপিয়ে জিততে হলে বিজেপির অভিষেক সিংহানিয়াকে কংগ্রেসের উপরে নির্ভর করতে হবে। শুধুমাত্র ফুলহার নদী-ভাঙনের ইস্যু তুলে লাভ হবে না।

    সুজাপুর

    গনিখান চৌধুরীর গড় হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্র থেকে গতবার তৃণমূল প্রার্থী ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটে জেতেন। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের 'লিড' ৮৪ হাজারের। সেচ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী তথা মোথাবাড়ির বিদায়ী বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিনকে এই কেন্দ্র থেকে এ বার দাঁড় করিয়েছে তৃণমূল। মালদা জেলা পরিষদের বিরোধী দলনেতা আব্দুল হান্নান কংগ্রেস প্রার্থী। তাঁর দাবি, গনিখানের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ২০১৬-য় তৃণমূলকে হারিয়ে এখানে জিতেছিলেন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী। এ বার জোট না হলেও বামফ্রন্ট প্রার্থী দেয়নি। সাবিনার সঙ্গে হান্নানের সরাসরি লড়াই। লড়ছেন বিজেপি প্রার্থী অভিরাজ চৌধুরীও।

    চাঁচল

    কংগ্রেস ফ্যাক্টর এই কেন্দ্রেও। গত বছর তৃণমূল ৬৭৩৩৮ ভোটে জেতে। এ বার শাসকের প্রার্থী প্রাক্তন আইপিএস প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মালদা জেলায় প্রায় তিন বছর পুলিশ সুপারের দায়িত্বে ছিলেন। গত লোকসভা ভোটে উত্তর মালদা লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থীও ছিলেন। হেরে যান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির রতন দাস। দীর্ঘ দিন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রাক্তন বিধায়ক, কংগ্রেস প্রার্থী আসিফ মেহবুবের পারফরম্যান্স নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। গত বারও এখানে তিনি 'হাত' চিহ্নে ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা মহববুল হক অতীতে এই কেন্দ্রের কংগ্রেস বিধায়ক ছিলেন। মোট ভোটার ছিলেন ২৪৪৪২৮। 'সার'-এ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে ১৫৮৭৬ জনের।

    হবিবপুর

    এই কেন্দ্রটি তফসিলি উপজাতি সংরক্ষিত। সিপিএম ও কংগ্রেস আলাদা প্রার্থী দিলেও লড়াই মূলত তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে। আগে এই বিধানসভা আসনটি বাম দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। পর পর দু'বার বিজেপি দখল করে। প্রাথমিক শিক্ষক অমল কিন্তু তৃণমূল প্রার্থী। তাঁর বক্তব্য, '২০১৬ এবং ২০২১-তে খুব কম ব্যবধানে বিজেপি আসনটি জিতেছিল। তাই এ বারে তৃণমূল ভালো ফল করবে।' বিজেপি প্রার্থী জুয়েল মুর্মু পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁর দাবি, 'রাজ্য সরকার এই এলাকার আদিবাসীদের জন্য কোনও উন্নয়ন করেনি। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নে আস্থা রাখবেন আদিবাসীরা।' কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়িয়েছেন রাজেশ সোরেন, সিপিএমের বাসুদেব মুর্মু। তাঁরাই গলার কাঁটা তৃণমূল-বিজেপির।

    বৈষ্ণবনগর

    গত নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৪৭১। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই বিধানসভায় 'সার' তালিকা থেকে বাদ গিয়েছ ১৫ হাজার ৯০৩ জনের নাম। তৃণমূল প্রার্থী চন্দনা সরকারের স্বামী পরিতোষ পেশায় ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতা। গত বিধানসভা নির্বাচনে স্বামীর হাত ধরেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী রাজু কর্মকার সক্রিয় আরএসএস কর্মী। কালিয়াচকের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক রাজুর বক্তব্য, 'বিজেপি এলে গঙ্গা ভাঙনের স্থায়ী সমাধান হবে।' মামণি মণ্ডল এই কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী। তিনিও ভাঙন সমাধানের কথা প্রচারে তুলে ধরছেন।

    মোথাবাড়ি

    গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল জিতেছিল ৫৬ হাজার ৩৭৩ ভোটে। দু'বছর আগে লোকসভা ভোটে হিসেব উল্টে দেয় কংগ্রেস। দ্বিতীয় বিজেপি ও তৃতীয় তৃণমূলের সঙ্গে 'হাত'-এর ভোটের ফারাক ছিল যথাক্রমে ৩৪ ও ৪৬ হাজার ভোটের। ফের পাশা উল্টে দিতে রাজ্যের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ নজরুল ইসলামকে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল। কংগ্রেস প্রার্থী সায়েম চৌধুরী গনিখান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। কালিয়াচকে সাম্প্রতিক গন্ডগোলের পরে এনআইএ-র জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছিলেন তিনি। এ জন্য চক্রান্তের অভিযোগও তুলেছেন সায়েম। বিজেপি প্রার্থী নিবারণ ঘোষ বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত। এখানকার ভোটের হিসেবনিকেশে 'সার' বিশেষ ফ্যাক্টর নয়। এই কেন্দ্রে 'সার'-পূর্ব সময়ে মোট ভোটার ১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৩৪৭। নাম বাদ দিয়েছে ৯ হাজার ৯১৪ জনের।

    গাজোল

    গত নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী চিন্ময় দেব বর্মন ১ হাজার ৭৯৮ ভোটে তৃণমূলকে পরাজিত করে জয়ী হন। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে পদ্মের 'লিড' বেড়ে হয় ৩৯ হাজার। এ বারও চিন্ময় প্রার্থী। 'সার'-এর চূড়ান্ত তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে ১৬, ৯৯৬ জনের। এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ইংরেজবাজারের কালিতলার বাসিন্দা প্রসেনজিৎ দাস। তিনি বর্তমানে তৃণমূলের জেলা যুব সভাপতি। পেশায় আইনজীবী প্রসেনজিত অবিবাহিত। তিনি বলেন, 'নির্বাচনী প্রচারে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের কথায় তুলে ধরা হচ্ছে।' এখানে কংগ্রেস, সিপিএম প্রার্থী দিলেও লড়াই মূলত তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে।

    মালতীপুর

    এই আসনটি হঠাৎ নজরকাড়া হয়ে উঠেছে মৌসম নুর প্রার্থী হওয়ায়। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের আব্দুর রহিম বক্সী ৯২ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। কংগ্রেস ছিল তিন নম্বরে। লোকসভা ভোটে কংগ্রেস 'লিড' নিয়ে নেয় ১৬ হাজার ভোটে, তিন নম্বরে চলে যান পদ্ম-প্রার্থী। এই এগিয়ে-থাকাকে বিধানসভায় জয়ে পরিণত করতে চাইছেন মৌসম। তিন বারের তৃণমূল বিধায়ক রহিম অবশ্য প্রকাশ্যে কংগ্রেসকে ফ্যাক্টর বলে মানছেন না। তাঁর কথায়, 'তৃণমূল জেলায় যা উন্নয়ন করেছে, বাম আমলেও তা হয়নি।' রহিমের ছেলে বাবু বক্সী জেলা পরিষদের মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ। বাবা-ছেলেকে নিয়ে নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। মৌসম কয়েক মাস আগে তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে ফিরেছেন। তিনি বলছেন এটা তাঁর 'ঘরে ফেরা'। মুখ্যমন্ত্রীও জনসভায় এই 'ঘরের মেয়ে'র নাম না করে সমালোচনা করেছেন। গনিখান চৌধুরীর উত্তরসূরির সঙ্গে তৃণমূলের জেলা সভাপতির জমজমাট লড়াই।

    তথ্য সহায়তা: কৌশিক দে

  • Link to this news (এই সময়)