পরনে গেরুয়া বসন। মুণ্ডিত মস্তক। সবে উপনয়ন হয়েছে। কিশোর বিতান অধিকারীর (Victim Bitan Adhikary) গলায় যজ্ঞোপবীত পরিয়ে হাতে পলাশ দণ্ড তুলে দিয়েছিলেন মামা শঙ্কর চক্রবর্তী। আজ, বুধবার ২২ এপ্রিল। পহেলগাম হামলার (Pahalgam Terror Attack) এক বছর পূর্ণ হলো। সেই দুপুরটার কথা বড় মনে পড়ছে শঙ্করের।
জঙ্গি হামলাটাও তো গত বছর ২২ এপ্রিল দুপুরেই হয়েছিল। ভাগ্নের মৃত্যুর খবরটা পেয়েছিলেন একটু পরে। তার পর যা হয়, শোক, কান্না আর অবিশ্বাসের দীর্ঘ যাত্রা। ৩৬৫ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু রক্ত আর আতঙ্ক আজও মুছে যায়নি। ফোনের ওপারে কথা বলতে বলতে গলা বুজে এল শঙ্করের, ‘বিশ্বাস করুন, এই দিন দেখতে হবে... সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা আর ভাগ্নে বৌ-কে নিয়ে নিয়ে ওর দেহের সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না।’
ভাগ্নেকে হারিয়ে এক বছর কী ভাবে কাটল? এই প্রশ্নটা বড় অমানবিক। ভালো কাটার তো কথা নয়। ভালো কাটেনি, কাটেওনা। তবু কেন্দ্রীয় সরকারকে অন্তত পাশে পাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু শঙ্করের অভিযোগ, তারা কথা রাখেনি। গলা থেকে একসঙ্গে ঝরে পড়ে ক্ষোভ আর দুঃখ, ‘এক বছরে একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি, জানেন। দিদি-জামাইবাবুর পাটুলির বাড়িতে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও প্রতিনিধি যায়নি। ওইটুকু বাচ্চা কেমন আছে, স্বামীকে হারিয়ে বিতানের স্ত্রীর কী ভাবে দিন কাটছে, কেউ জানতে আসেনি।’
তবে রাজ্য সরকারের প্রশংসা করলেন মুক্ত কন্ঠে। কোনও রাখঢাক না রেখে খোলাখুলি বললেন, ‘যা করার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই করেছে। গত বছর ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী নিজে দিদি-জামাইবাবুর হাতে ১০ লক্ষ টাকা তুলে দিয়েছিলেন। ১০ হাজার টাকার একটা মাসিক পেনশনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। আমরা কৃতজ্ঞ।’
বিতানের বাবার বয়স হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর পরে শরীর ভেঙেছে। অনেকটা স্মৃতিভ্রংশের মতো উপসর্গও দেখা দিয়েছে। মাঝে মধ্যেই কী করছিলেন ভুলে যান। ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকাপয়সার হিসাব করতে পারেন না। শঙ্করের কথায়, ‘মেমরি ফল করছে। আসলে ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পরে দিদি খুব কেঁদেছিল। কিন্তু জামাইবাবু এক ফোঁটাও কাঁদেনি। শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল। ওখান থেকেই বোধহয়...।’ ফোনের অপর প্রান্তে নীরবতা। শঙ্কর চুপ করে গিয়েছেন। হয়তো নিজেকে বলছেন, ‘পুরুষ মানুষকে কাঁদতে নেই।’
বাবা-মাকে খুব ভালোবাসতেন বিতান। সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে শঙ্করের এই সব কথাই আজ মনে পড়ছে। তাঁর সিন্দুকের তলানিতে তো স্মৃতিটুকুই রয়েছে শুধু, ‘পহেলগামে হামলার কয়েক বছর আগেই দিদির বুকে পেসমেকার বসান ডাক্তাররা। সব খরচ পাঠিয়েছিল বিতান। ২০২৪-এ চোখে অপারেশন হয়। তখনও বিতান আসতে পারেনি। কিন্তু টাকাপয়সা ঠিকই পাঠিয়ে দিয়েছিল। কখনও মা-বাবাকে অবহেলা করেনি।’
ভাগ্নের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতো। তিনি শুধু মামা নন, বিতানের ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড। শঙ্করের কথায়, ‘আমাকে সব কথা বলত। সুবিধা-অসুবিধা বলুন, ভালোলাগা খারাপ লাগা - সব।’ ফের গলা বুজে আসে শঙ্করের।
স্ত্রী সোহিনী আর তিন বছরের পুত্র হৃদানকে নিয়ে বিতান থাকতেন ফ্লোরিডায়। সেখানেই একটি বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করতেন। গত বছরের ৮ এপ্রিল তাঁরা কলকাতায় ফেরেন। তার পরে ১৬ এপ্রিল পাড়ি দেন পহেলগাম। মা-বাবাকেও নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শঙ্কর বললেন, ‘জামাইবাবুই বলেছিলেন, বৌমাকে নিয়ে তোরা ঘুরে আয়।’ তার পরে ২২ এপ্রিলের সেই রক্তাক্ত দিন। ধর্ম জিজ্ঞাসা করে ২৬ জন পুরুষ পর্যটককে গুলি করে মারে জঙ্গিরা। ছেড়ে দেওয়া হয় তাঁদের স্ত্রীদের। মৃতদের মধ্যে ছিলেন বিতানও।
সুখের সময় খুব দ্রুত কেটে যায়। চোখের পলকে। কিন্তু শোক কাটতে চায় না। আর স্মৃতি, সে তো সততই দুঃখের। বিতানকে এক সময়ে কোলেপিঠে করে ঘুরেছেন। স্কুলে দিয়ে এসেছেন। এখন বিতানের ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ইউনিফর্ম পরে, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে গুটি গুটি পায়ে গাড়িতে ওঠে হৃদান। শঙ্কর বললেন, ‘স্কুলের নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। কিন্তু যখন স্কুলে যায় না, মনে হয় যেন বিতান যাচ্ছে। ছেলের মুখটা একদম বাবা বসানো।’ নাতির মধ্যেই এখন ভাগ্নেকে খুঁজে পান শঙ্কর।