• মাছ থেকে ভাতা, যে ভাবে মমতার ন্যারেটিভেই মমতাকে কাউন্টার করছে BJP
    আজ তক | ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। প্রায় প্রতিটি জনসভাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন,  ওরা (BJP) বাংলায় মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া বন্ধ করতে বলেছে। নির্বাচনী জনসভায় মমতা বলছেন, 'বিজেপি আপনাদের মাছ খেতে দেবে না। মাংস বা ডিমও খেতে দেবে না।' যার পাল্টা হিসেবে মাছ নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে গেরুয়া শিবিরও। প্রায় প্রতিদিনই বাংলায় বিজেপি প্রার্থীদের দেখা যাচ্ছে মাছ খেতে বা মাছের গুণগান গাইতে। কোনও প্রার্থী আবার মাছ নিয়ে প্রচার করছেন। কেউ বাজারে গিয়ে মাছ কিনছেন।

    বলাই যায়  ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইটা শুধু ভোটের নয়, বরং 'মাছ' নিয়েও। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে নিয়ে যে আখ্যান তৈরি করেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই আখ্যানকে প্রতিহত করতে ময়দানে নেমেছেন বিজেপি নেতারা। বিজেপির তারকা প্রচারকরা মাছ-ভাত খেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে জবাব দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতার মাছ-ভাত খাওয়ার ছবি ও ভিডিও দেখা গেছে। মঙ্গলবার, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী  অনুরাগ ঠাকুরের মাছ-ভাত খাওয়ার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনুরাগ ঠাকুরকে কলকাতায় মাছ-ভাত উপভোগ করতে দেখা যায়। এই ভিডিওটি বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি কি তার হিন্দি-অঞ্চলের নিরামিষাশী ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে বাঙালি পরিচয়কে গ্রহণ করার চেষ্টা করছে?

    অবাঙালি নেতাদের মাছ প্রীতি
    শুধু অনুরাগ নয়, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চম্পাই সোরেনকেও ইনস্টাগ্রামে মাছ খাওয়ার একটি ছবি পোস্ট করতে দেখা গেছে। প্রাক্তন বিদেশ  সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাও মাছ খাচ্ছেন। প্রাক্তন বিদেশ সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা কলকাতায় মাছ-ভাত খেতে খেতে বলেন, 'আমার প্রিয় খাবার মাছ। আর আমি সব ধরনের মাছই পছন্দ করি, তা চিংড়ি, মাগুর, পাবদা, রুই বা কাতলাই হোক। আমার মূল বক্তব্য হলো, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সমুদ্র, নদী, পুকুর—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও বাংলায় সত্যিই উল্লেখযোগ্য কোনো মৎস্য চাষ শিল্প নেই।' ওড়িশার বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়নে অংশ নিতে এসে বলেছিলেন,  তিনি মাছ খেয়েছেন এবং মাছ ও ডিম দুটিই খান। এখানেই শেষ নয়, অসমরে মুখ্যমন্ত্রী  হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলছেন,  তৃণমূলের থেকে বিজেপির কর্মীরা বেশি মাছ মাংস খেয়ে দেখিয়ে দেবে। পুরুলিয়ার নির্বাচনী জনসভা করতে এসে আমিষ খাওয়া নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। 

    আসলে, নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই আখ্যানটি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাসের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি একটি 'নিরামিষ সংস্কৃতি' চাপিয়ে দিতে চায়। এই 'বাঙালি-বিরোধী' ভাবমূর্তি মোকাবেলা করতে বিজেপি এবার 'খাদ্য রাজনীতি'-র আশ্রয় নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মাছের বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং এ বিষয়ে কথা বলেছেন।  জনসভায় মোদী বলেছেন, '১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরেও তৃণমূল কংগ্রেস আপনাদের মাছের মতো একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকে মাছও আমদানি করতে হয়।' বিজেপির জন্য এই নির্বাচন শুধু জয়লাভের বিষয় নয়, বরং 'বহিরাগত' হওয়ার ধারণা ভাঙারও বিষয়, এবং মাছ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

    বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বেশ কয়েকবার স্বামী বিবেকানন্দের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন  বাংলার সংস্কৃতিতে মাছ ও মাংসের এক অনন্য তাৎপর্য রয়েছে এবং তা কেউ থামাতে পারবে না। শুভেন্দু অধিকারীকে প্রায়শই স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে বসে মাছ-ভাত খেতেও দেখা গেছে। বিজেপির এই পদক্ষেপের পেছনে একটি সুচিন্তিত কৌশল রয়েছে। দলটি এই বার্তা দিতে চায় যে, তারা বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা এবং রন্ধনশৈলীকে সম্মান করে। 

    এর নির্বাচনী প্রভাব কী হবে?
    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির ‘মাছ ও ভাত’ তাস টিএমসি-র সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ‘বাঙালি পরিচয়’-এর ধার ভোঁতা করে দিতে পারে। বাংলায় মাছ শুধু খাবার নয়, পরিচয়ের প্রতীক। বিজেপি নেতারা এখন মাছের বাজারগুলোতে দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলতে এবং মাছের দাম ও উৎপাদনের প্রশ্নে টিএমসি সরকারকে কোণঠাসা করছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত অনেকেই জনসভায় টিএমসি-র বিভ্রান্তিকর মাছ প্রচারের জবাব দিয়েছেন। তবে কেমল মাছ নয়, তৃণমূলের পতিটি পদক্ষেপকেই এবার সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে গেরুয়া শিবির। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার হোক বা তৃণমূলের যুবসাথীর পাল্টা যুবশক্তি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এবার ইটের বদলে পাটকেল নীতি নিয়ে চলছে গেরুয়া শিবির।
  • Link to this news (আজ তক)