হুডখোলা জিপে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে প্রার্থী গাইছেন। ডিজে বক্স হয়ে সেই গানে জোরালো আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। এলাকায় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হলেও, ভোটভিক্ষায় বেরোনো লোকেদের তাতে পরোয়া নেই! তাঁরা উচ্ছ্বসিত। বাংলার ভোটে এই ছবি হামেশাই দেখা যায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে খানিক বিরল ছবিই তৈরি করলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট পশ্চিমের তৃণমূল প্রার্থী সামিম আহমেদ। তাঁর প্রচারের সুর বাঁধা হলো বাউল গানে। প্রার্থীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাউল সাধকেরা গাইলেন, ‘পশ্চিমের ওই মগরাহাট/ মানুষ এ বার দিচ্ছে ডাক,/ উন্নয়নে শামিল হতে চাইছে রে,/ কে হিন্দু, কে মুসলমান/ ভুলে সব বেদ-বিধান,/ সম্প্রীতির সাথে সবাই আমরা চলবো রে।’
মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভার তিন বারের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন মোল্লাকে এ বার টিকিট দেয়নি তৃণমূল। তাঁর পরিবর্তে সামিমকে প্রার্থী করেছে তাঁরা। তৃণমূলের অভ্যন্তরে তিনি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। তৃণমূল সূত্রে খবর, গত লোকসভা ভোটের আগে থেকেই মগরাহাট পশ্চিমে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চোরাস্রোত বইছিল। বিধায়ক অনুগামী ও বিরোধী গোষ্ঠীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে। দু’পক্ষের বচসা মেটাতে কিছু দিনের জন্য অস্থায়ী পর্যবেক্ষক হিসেবে এক নেতাকে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব আরও বাড়তে থাকায় পর্যবেক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্য দিকে, সামাজিক মাধ্যমে দলের বিরুদ্ধে একাধিক মন্তব্য করে বিতর্কে জড়ান গিয়াসউদ্দিন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের অভিযোগ তুলে বেশ কয়েক বার সরব হতে দেখা যায় দলেরই নেতা-কর্মীদেরও। অন্য দিকে, সামিম এত দিন ডায়মন্ড হারবার বিধানসভার পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। কয়েক মাস আগে তাঁকে ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট পশ্চিম ও মহেশতলা বিধানসভার কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব দেয় দল। সেই সুবাদে মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভায় কার্যত চষে বেরিয়েছেন তিনি। তা নজরে রেখেই সামিমকে টিকিট দিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব।
সামিমও জানান, দল প্রার্থী ঘোষণা করার পর থেকেই তিনি প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন। ঘুরছেন এলাকায় এলাকায়। প্রচারের মাঝেই গ্রামের মহিলারা শাঁখ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে সামিমকে বরণ করছেন, এমন ছবিও দেখা গিয়েছে। প্রার্থী বলেন, ‘আমরা চাই, মানুষ এখানে শান্তিতে থাকুন। একসঙ্গে থাকুন। আমি প্রচারে সেই বার্তাই দিচ্ছি। আমার বিশ্বাস, মানুষ আমার কথা শুনবেন।’
মগরাহাট পশ্চিমে এ বার ত্রিমুখী লড়াই। সেখানে বিজেপি প্রার্থী করেছে গৌরসুন্দর ঘোষকে। তিনি পেশায় আইনজীবী এবং এলাকার বাসিন্দা। বিজেপির দাবি, তাদেক প্রার্থীর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে এলাকায়। ২০২১ সালের বিজেপি প্রার্থী ধূর্যটি সাহার মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি। এতে খানিক সহানুভূতির ভোট পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে, আইএসএফ প্রার্থী আজিজ় আল হাসান। তাঁকে সমর্থন করছে বামফ্রন্ট। গত বার এই আসনে ভালো ভোট পেয়েছিল আইএসএফ। এ বারও তারা সেই ভোট ধরে রাখতে পারে। প্রার্থী দিয়েছে কংগ্রেসও। আব্দুল মাজিদ হালদার হাত শিবিরের প্রার্থী হয়েছেন। সব মিলিয়ে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে এই কেন্দ্রে।
যদিও এতে আশঙ্কার কিছু নেই বলেই মনে করছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য, সংখ্যালঘু মানুষ জানেন, এসআইআর পর্বে তৃণমূলই তাঁদের পাশে প্রথম থেকে ছিল। তাঁরা জানেন, বিজেপির বিরুদ্ধে একমাত্র তৃণমূলই লড়তে পারবে। তাই তাঁরা তৃণমূলের পাশেই থাকবেন। সামিম বলেন, ‘এসআইআর-এ মানুষের দুর্ভোগের শেষ ছিল না। লাখ লাখ মানুষকে লাইন দাঁড়াতে হয়েছে। এ সবের ফল তো অবশ্যই পড়বে ভোটে। এসআইআর-এ সাধারণ মানুষকে নানা ভাবে হেনস্থা করা হল। এ সবের জবাব ভোটে দেবেন মানুষ।’