৮০০ কর্মীকে গ্রেপ্তারির আশঙ্কায় কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের করা তৃণমূলের মামলায় ধাক্কা নির্বাচন কমিশনের। বুধবার হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের এজলাসে এই মামলা ওঠে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্রেফ অশান্তির আশঙ্কায় দাগিয়ে ঢালাও গ্রেপ্তার করা যাবে না। বিচারপতিরা সাফ জানান, কমিশন যদি এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার উপর স্থগিতাদেশ জারি করা হচ্ছে।
যাঁদের ‘ট্রাবল মেকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করা, ভয় দেখানো সহ একাধিক অভিযোগে নজরদারি এবং প্রয়োজনে গ্রেপ্তারির নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে আপাতত নির্বাচনী আবহে এই সমস্ত তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে আগাম গ্রেপ্তারির মতো কোনও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। এই নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় বুধবার জানিয়ে দিল কলকাতা হাই কোর্ট।
শুধু তাই নয়, কমিশনের প্রকাশিত ওই তালিকায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশও দিয়েছে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথী সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থার নাম করে আগামী ৩১ জুন পর্যন্ত তৃণমূলের কর্মীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এটাও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, কেউ কোনও অপরাধমূলক কাজ করলে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আগাম গ্রেপ্তার করা যাবে না। বাংলার প্রথম দফা ভোটের আগে কার্যত এটা তৃণমূলের বড় জয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও এনিয়ে সুর ছড়িয়েছিলেন। এদিনের নির্বাচনী জনসভা থেকে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, “বিজেপির সব চেয়ে বড় ক্রিমিনাল গদ্দার রাকেশ সিং, এঁদের কেন গ্রেপ্তার করা হবে না? এঁদের বিরুদ্ধে তো অনেক অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূলকে শুধু টার্গেট করবেন !”
বিনা কারণে দলীয় কর্মীদের গ্রেপ্তারের অভিযোগ তুলে এদিনই নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত আধিকারিকদের হুঁশিয়ারি দিল তৃণমূল কংগ্রস। বুধবার দলের পক্ষ থেকে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে তৃণমূল সাংসদ তথা রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার বলেন, “এমন নয় যে নির্বাচন হয়ে গেলে আমরা সব ভুলে যাব। প্রতিটি বেআইনি গ্রেপ্তারের ঘটনায় যুক্ত আধিকারিককে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি যে রাজ্য থেকে বা যে বিভাগ থেকেই আসুন না কেন।”
তাঁর কথায়, “আইনি পদক্ষেপের সময়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের কারও কোনও অজুহাতই শোনা হবে না।” গোলমাল সৃষ্টি করতে পারেন বা ‘ট্রাবল মেকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তৃণমূলের একাধিক সংসদ, বিধায়ক, পুরসভা ও পঞ্চায়েতের প্রতিনিধির নাম প্রকাশ করা হয়। তালিকা মতো গ্রেপ্তারির আশঙ্কায় হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তৃণমূল। তাদের আশঙ্কা, প্রিভেনটিভ ব্যবস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন তাদের ৮০০ কর্মীকে গ্রেপ্তার করতে পারে। এদিন এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে আদালতে জোড় সওয়াল করেন তৃণমূলের সাংসদ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাবল মেকারদের তালিকা প্রকাশ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
তিনি বলেন, এরা সবাই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী। ওই তালিকায় উত্তরপাড়ায় কাউন্সিলরদের নামও আছে। কল্যাণ আরও বলেন, কেউ যদি আইন ভঙ্গ করেন তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কমিশন এবং পুলিশের ক্ষমতা আছে। কমিশন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না, সেই ক্ষমতা পুলিশের আছে। কিন্তু এভাবে সার্বিকভাবে একটা নির্দেশিকা জারি করা যায় না। তাঁর দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন। এই তালিকা ভিত্তিহীন এবং কোন কারণ না দেখিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। তিনি বলেন, “অশান্তি বাঁধাতে পারে বলে কাউকে দাগিয়ে দিতে পারে না কমিশন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাজ্যের।” তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনকে ব্যাখ্যা করতে হবে যে তারা কোন ক্ষমতার বলে এই নির্দেশিকা জারি করেছেন।” বিচারপতি পার্থসারথি সেন প্রশ্ন, রাজ্য বা পুলিশ কি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এই নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে কোনো পদক্ষেপ করেছে কি। রাজ্য জানায়, যতদূর জানি এখনো কিছু করা হয়নি।
পালটা জাতীয় নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডিএস নাইডু বলেন, কমিশন কখনই বলেনি যে, যান গিয়ে যাকে ইচ্ছা গ্রেপ্তার করে নিন। কমিশন বলেছেন সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য আইন মেনে সব পদক্ষেপ করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন করা। তিনি দাবি করেন, আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। জুডিশিয়াল অফিসারদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে, ঘেরাও করা হয়েছে। নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার জন্য আমাদের সুপ্রিম কোর্টের রোষের মুখে পড়তে হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের ১৪২ ধারা প্রয়োগ করতে হয়েছে।
কমিশন বলে, অপরাধমূলক কাজের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে তার কাছে তো আইনি সংস্থান আছে। তিনি জামিনের আবেদন করতেই পারেন। রাজ্য পুলিশের ডিজি ও কলকাতার পুলিশ কমিশনারের আইনজীবী জয়দীপ কর বলেন, কমিশনের গতকালের নির্দেশিকার ভিত্তিতে কোনো এফআইআর হয়নি। যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো আদালতগ্রাহ্য অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এফআইআর দায়ের করতে পারি না। কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা দ্রুত আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করব। কারো মৌলিক অধিকার খর্ব করা আমাদের উদ্দেশ নয় বলে জানায় পুলিশ।