নন্দীগ্রামের ভোট দায়িত্বে ‘দাদা ঘনিষ্ঠ’ দুই ইন্সপেক্টর, অভিযোগ তৃণমূলের
বর্তমান | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
শ্রীকান্ত পড়্যা, নন্দীগ্রাম: আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তি থাকার অভিযোগ উঠেছিল দুই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে। তদন্ত চালিয়েছিল দুর্নীতি দমন শাখা। জমা পড়েছিল চার্জশিটও। তাঁদের একজন অতীতে নন্দীগ্রাম থানার ওসি ছিলেন। অন্যজন ছিলেন হলদিয়া থানার অফিসার-ইনচার্জ। দু’জনেই ‘দাদা’র ঘনিষ্ঠ বলে জেলার পুলিশমহল থেকে শুরু করে জেলাবাসীর মধ্যেও চর্চায় ছিলেন। ভোটের ঠিক আগের মুহূর্তে সেই অজয় মিশ্র ও মহম্মদ কুদরতে খোদাকে নন্দীগ্রামে নামাল কমিশন। দু’জনেই এখন ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার অফিসার। তৃণমূলের অভিযোগ, নন্দীগ্রামে ‘দাদা’র নাগাড়ে অসহিষ্ণু কথাবার্তা ও ঘৃণার রাজনীতি সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারছেন না। ভোটে নির্ঘাত পরাজয় বুঝে ত্রাতা হিসেবে অজয় ও খোদাকে মাঠে নামানো হয়েছে। ‘দাদার আবদার’ মেনে কমিশনের এমন সিদ্ধান্ত বলেও অভিযোগ শাসক শিবিরের।
খোদা সাহেব বর্তমানে পূর্ব বর্ধমানের কালনায় ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এবং অজয় মিশ্র বারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটে কর্মরত। ভোটের পাঁচদিন আগে তাঁদের নন্দীগ্রাম থানায় আনা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই থানায় আগে থেকেই কমিশন নিযুক্ত আইসি শুভব্রত নাথ রয়েছেন। তারপরও নতুন করে দু’জন ইন্সপেক্টর নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, তাদেরকে ‘টাইট’ দিতে ও এলাকায় আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করতে দু’জনকে নিয়ে আসা হয়েছে। এসেই আধাসেনা সঙ্গে নিয়ে নন্দীগ্রামে দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছেন দুই পুলিশ ইন্সপেক্টর। অজয়বাবু প্রাক্তন ওসি থাকার সুবাদে হাতের তালুর মতো চেনেন নন্দীগ্রামকে। একুশের নির্বাচনেও দু’জনে নন্দীগ্রামের দায়িত্বে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের নেতাদের গ্রেপ্তার, শাসানি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ তৃণমূলের। যেমন, মঙ্গলবার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দামারি-জালপাই অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতি উত্তম প্রামাণিক ও মির্জাচকের শেখ মুকলেসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি, এনআইএ নোটিস পাওয়া তৃণমূল নেতাদের বাড়িতে গিয়ে ধমকানি-চমকানিও দেওয়া হচ্ছে। দুই ইন্সপেক্টরের ভূমিকায় নন্দীগ্রামজুড়েই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেটা বিজেপির পক্ষে বুমেরাং হতে পারে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বুধবার দুপুরে নন্দীগ্রাম থানায় ছিলেন কাজল জানা। তিনি ধৃত তৃণমূলে অঞ্চল সভাপতি উত্তম প্রামাণিকের দিদি। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে ভাই বাসন্তীবাজারে ছিল। তার সঙ্গে আরও এক তৃণমূল কর্মী মির্জাচক গ্রামের শেখ মুকলেস ছিলেন। সেখান থেকেই দু’জনকে পুলিশের গাড়িতে তুলে থানায় আনা হয়। কী কারণে গ্রেপ্তার করা হল জানি না।’
বেলা তখন সাড়ে ১২টা। নন্দীগ্রাম থানা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় অজয়বাবু ও খোদা সাহেব। দু’জনেই একটি গাড়িতে ছিলেন। সঙ্গে আধাসেনার কনভয়। যেন বিশাল কোনো অভিযানে যাচ্ছেন! স্থানীয় বাসিন্দারা কটাক্ষ করে বলছেন, একবছর আগে যদি এমন নিরাপত্তা কাশ্মীরে দেওয়া হতো, তা হলে পেহেলগাঁওয়ে জঙ্গিহানা রুখে দেওয়া যেত। তৃণমূলের অভিযোগ, নন্দীগ্রামে দু’জনে আসার পর থেকেই বেছে বেছে তৃণমূল নেতাদের টার্গেট করছেন। সোমবার গ্রেপ্তার করা হয় মহম্মদপুর গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান শেখ হাবিবুলকে। মঙ্গলবারও গ্রেপ্তার হয় উত্তম ও মুকলেসকে। এছাড়াও ব্লক কোর কমিটির নেতাকে বাহিনী ধাওয়া করছে। স্বভাবতই এনআইএ নোটিস পাওয়া তৃণমূল নেতাদের এখন মোবাইল বন্ধ।
জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি সুজিত রায় বলেন, ‘মানুষের উপর আস্থা রাখতে পারছে না বিজেপি। তাই পুলিশ দিয়ে ভোট করাতে চাইছে। তাই অজয় মিশ্র, কুদরতে খোদার মতোর ইন্সপেক্টরদের নন্দীগ্রামে আনা হয়েছে। তাঁরা তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তার করছেন। এতকিছুর পরও এখানে বিজেপি হারবে।’ জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মেঘনাদ পাল বলেন, ‘এখানে ওঁদের কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় আনা হয়েছে। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’ বুধবার নন্দীগ্রাম থানার সামনে বিজেপি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ দুই পুলিশ ইন্সপেক্টর।