চঞ্চল প্রধান, নন্দীগ্রাম
চৌরঙ্গী বাজারে হঠাৎ-ই দেখা হয়ে গেল কবীরের সঙ্গে। নয় নয় করে দশ বছর পরে। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে এই নন্দীগ্রাম থেকেই সিপিআইয়ের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে। পুরো নাম শেখ আব্দুল কবীর। এখন ৭০ পেরিয়েছেন। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্রব আর নেই বললেই চলে।
গা-জ্বলে যাওয়া গরমে পথের পাশে ঝুপড়ি দোকানের ছায়ায় কাছে টেনে কুশল বিনিময়ের পরে অমোঘ প্রসঙ্গটা এল। কী বুঝছেন? খানিকটা উদাস হয়ে বললেন, 'মনে তো হচ্ছে বাম সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী এবং কংগ্রেস প্রার্থী সংখ্যালঘু ভোট কাটবেন। আর সেরকম হলে শুভেন্দুরই সুবিধে।' আইএসএফ প্রার্থীকে বামফ্রন্ট সমর্থন করলেও আলাদা করে সিপিআইয়েরও এক নেতা ভোটে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। তা নিয়ে বিড়ম্বনার অন্ত নেই কবীরের মতো মানুষদের।
প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হচ্ছে তার মধ্যে সম্ভবত সবথেকে নজরকাড়া কেন্দ্র নন্দীগ্রাম। পূর্ব মেদিনীপুরের এই কেন্দ্রেই গত বিধানসভা ভোটে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফল সকলেরই জানা। এ বার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তৃণমূল পবিত্র করকে দাঁড় করিয়েছে। যে পবিত্র একসময়ে শুভেন্দুর ছায়াসঙ্গী ছিলেন, যিনি শুভেন্দুর প্রতিটি চাল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তিনি বিরোধী দলনেতাকে কতটা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নিতে পারবেন তা নিয়ে উৎসাহ রয়েছে নন্দীগ্রামে।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'সেবাশ্রয়' ক্যাম্পে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের চিকিৎসা পবিত্রকে কতটা 'অ্যাডভান্টেজ' দেবে, তা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। স্থানীয় গোপীমোহনপুরের বাসিন্দা, পেশায় টোটোচালক শেখ হোসেনুর তো অকপটেই বলছেন, 'তৃণমূল অনেক উন্নয়ন করেছে। মানুষ এই সরকারের কাছ থেকে অনেক সুবিধে পেয়েছে।'
পবিত্রকে পাওয়া গেল বাড়িতে। ক্রমাগত বেজে চলেছে তাঁর মোবাইল। ফোনে দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে একটানা কথা বলে চলেছেন। মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে ব্যক্তিগত ভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখাও করে এসেছেন। দিনের মধ্যে একসময়ে ভেকুটিয়া ঘুরে এসেছেন। মঙ্গলবার সেখানেই কান্ডপসরা গ্রামের ৫১ এবং ৫২ নম্বর বুথে বিজেপি এবং তৃণমূলের সংঘর্ষ হয়। অভিযোগ, বিজেপির বাইক-বাহিনী তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে। স্থানীয় তৃণমূল কর্মী নারায়ণ মালাকার বলেন, 'আমার আলমারি ভেঙে গয়না লুট করেছে।'
নারায়ণের স্ত্রী সীমা মালাকারের অভিযোগ, তাঁর টেলারিং মেশিন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির টোটো পুকুরে ফেলে দিয়েছে। তৃণমূলের তমলুক সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুজিত রায় বলেন, 'শুভেন্দু অধিকারী হেরে যাবে বলেই আমাদের কর্মীদের উপরে গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। আমরা ১৫ জনের নামে এফআইআর করেছি।' বিজেপির নন্দীগ্রাম-১ এর মণ্ডল সভাপতি ধনঞ্জয় ঘড়ার পাল্টা দাবি, 'তৃণমূলই হামলা করেছিল। আমাদের কর্মী মঙ্গল মাইতিকে বেধড়ক মেরেছে। তিনি নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।' রক্তপাতের ইতিহাসের নিরিখে যাকে নগন্য বলছে প্রশাসন। বৈশাখের দুপুরে গরমে চিড়বিড় করে উঠছে শরীর। শুনশান সোনাচূড়া, তেখালি, অধিকারীপাড়া, বয়াল, রেয়াপাড়ার অধিকাংশ রাস্তা। রাস্তার মোড়ে কোথাও ইতিউতি দেখা মিলেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর। চায়ের দোকান, গলির মোড়, পথচলতি মানুষের মধ্যে ঘুরেফিরে এসেছে ফিস-ফাস আলোচনা। যার কেন্দ্রে শুভেন্দুই। বাম আমলে জোর করে জমি অধিগ্রহণ এবং শুভেন্দুরই নেতৃত্বে আন্দোলন এবং শেষে সরকারের পিছু হটে যাওয়া এখনও ভোলেননি অনেকে। শুভেন্দুর হয়েই বাজি ধরতে দেখা গেল স্থানীয় শেখ মাসুদকে। তাঁর দাবি, 'শুভেন্দু অধিকারী প্রতিবাদী। রাজ্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এই নন্দীগ্রাম তাঁরই গড়। ও নন্দীগ্রামেরই ছেলে।'
বুধবার দিনের কোনও এক সময়ে রেয়াপাড়ায় এসে ঘুরে গিয়েছেন শুভেন্দু। জানা গেল, কিন্তু, ধরা গেল না। বৃহস্পতিবার, ভোট শেষ হলেই ছুটবেন কলকাতায়। ভবানীপুরে শুরু করবেন প্রচার। সেখানে নন্দীগ্রাম নেই, কিন্তু বিরুদ্ধে মমতা রয়েছেন।