রেণুকা রায়। ভারতের সংবিধান রচনার সময় ১৫ জন মহিলার মধ্যে একজন। ইউনিফর্ম সিভিল কোডের জন্যও খুব জোরালোভাবে বলেছিলেন। বলেছিলেন, আলাদা করে মেয়েদের সংরক্ষণ না দিয়ে তাঁদের যোগ্যতা অনুসারে আরও ক্ষমতায়ন করুন। তাহলে ‘সংরক্ষণ’ প্রয়োজন হবে না। বঙ্গভোটের ইতিহাসের আজ পর্ব ১২।
কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডর আবার এসে দাঁড়িয়ে আছে আমার ঘরের সামনে। গাড়িতে বসে, গাড়ির দরজা বন্ধ করতেই চালক পিছন ফিরে বললেন, ‘‘চলুন, আজ আপনার সঙ্গে আলাপ করে দিই রেণুকা রায়ের।’’ আমি বললাম, ‘‘রেণুকা রায়? নামটি যেন কেমন চেনা চেনা লাগছে।’’ বিরক্ত ড্রাইভার বললেন, ‘‘আপনাদের আজকালকার সাংবাদিকদের এটাই সমস্যা। ইতিহাস এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে চলে? ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’ নিয়ে এত আলোচনা করছেন, মহিলাদের কথা বলছেন, নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দেবে অধিকার?’’ তা বেশ! আমাদের দেশে সেই গার্গী-অরুন্ধতীর সময় থেকে এই হালের ভোটের যুগেও ‘সাহসী নারী’ কখনও কম পড়ে নাই। নতমস্তকে চালকের কথা শুনলাম। স্টিয়ারিং তাঁর হাতে। গিয়ে পৌঁছলাম রেণুকা রায়ের বাড়িতে। তিনি পশ্চিমবঙ্গে, ১৯৫৭ সালে মালদা নির্বাচন কেন্দ্র থেকে জিতে লোকসভায় পৌঁছেছিলেন।
আমি বললাম, ‘ও! সেই রেণুকা রায়!’ ভারতের সংবিধান রচনার সময় ১৫ জন মহিলার মধ্যে একজন। ইউনিফর্ম সিভিল কোর্টের জন্যও খুব জোরালোভাবে বলেছিলেন। আর বলেছিলেন, আলাদা করে মেয়েদের সংরক্ষণ না-দিয়ে তাঁদের যোগ্যতা অনুসারে তাঁদের ক্ষমতায়ন করুন। তাহলে আর ‘সংরক্ষণ’ প্রয়োজন হবে না। সে তো স্বাধীনতার আগের কথা। সময় বদলে গিয়েছে, ভাবনাও। রেণুকা রায় ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ – এই সময়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে, বিধানসভাতেও ছিলেন। ডাক্তার বিধান রায়ের ক্যাবিনেটের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন। সেসময় ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং উদ্বাস্তুদের সমস্যা ভাবা যায়! কত যে গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি কাজ করেছিলেন।
রেণুকা রায়ের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। ব্রাহ্ম পরিবার। কত আধুনিক। যেন মনে হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের পরেশবাবুর বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। সেখানে রেণুকা রায় সুচরিতার মত প্রজ্ঞাবান নারী। নারীদের অধিকারের জন্য তিনি কিছু কম লড়াই করেননি। তিনি ’৫৭ থেকে ’৬৭ সংসদে যান। সেখানে রেণুকা রায় কমিটি তৈরি হয়েছিল। সামাজিক কল্যাণ এবং পিছিয়ে যাওয়া শ্রেণির কল্যাণের জন্য কী কী প্রকল্প নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করতে। প্রান্তিক মানুষদেরও উন্নতি সাধন করতে হবে। তবেই ভারতের উন্নতি হবে। একথা রেণুকা রায় বলেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটরঙ্গে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে রেণুকা রায়ের স্মৃতি। তাঁর লেখা একটি বই এখনও ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রয়েছে। বইটির নাম: ‘My Reminiscences: Social Development During the Gandhian Era and After’। আসলে বাড়িতে পৌঁছেই বুঝতে পারছি, ঠাকুরদা অধ্যাপক পি. কে. রায় প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন। এমনকী, ঠাকুমা সরলা রায়ও ছিলেন একজন সমাজসেবিকা। মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে রেণুকার রাজনীতিতে আসা। রেণুকা বলেছিলেন, এই ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা আমার জন্য নয়। তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন।
রেণুকাদেবীর সঙ্গে কথা বলছি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। প্রশ্ন করেছিলাম – ব্রিটিশদের শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে ‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স’-এ থেকে স্নাতক হয়েছিলেন, এমনটা কেন? রেণুকা বললেন, ‘‘আসলে শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিন্তু লড়াই ছিল না। ব্রিটিশদের কাছ থেকে তো আমরা ট্রেনও পেয়েছি। রেলগাড়ির পত্তন তো ওরাই করেছিল। তাই বলে কি রেলে উঠব না? কিন্তু সেসময় ইংরেজি শিক্ষার প্রতিবাদ না-জানালে আমাদের নিজস্ব ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার উত্থান হত না।’’
১৯৮৮ সালের অনেক পরে, এই তো সেদিন তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ভোটের সময় বারবার লড়েছেন। বারবার জিতেছেন। ১৯৪৩ সালে, অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে তিনি আইনি সংস্কার করছেন কেন্দ্রীয় লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে এসে। তারপর তিনি কনস্টিটিউশন্যাল অ্যাসেম্বলির অন্যতম সদস্য হচ্ছেন। ভারতীয় সংবিধান রচনার কাজে তিনি লিপ্ত। ভাবা যায়, একজন বাঙালি নারী! তারপরে তিনি বিধান রায়ের ক্যাবিনেটে, তারপর লোকসভায়। প্রত্যেকটা ভোটে তিনি জিতেছেন আর দাপিয়ে ভোটের সময় প্রচার করেছেন।
আজকের ভোটপ্রচারে যখন নানা ধাঁচের নারী প্রতিনিধিকে দেখি তখন আমার রেণুকা রায়ের কথা মনে পড়ে। তবে শুধু রেণুকা রায়কে নিয়ে থামব কেন? বীণা দাস, মণিকুন্তলা সেন, পূরবী মুখোপাধ্যায় থেকে আভা মাইতি। কোনও নামই বাদ দেওয়ার নয়। আর এই সেদিনের গীতা মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে তো আমার ব্যক্তিগতভাবে জানার, চেনার, কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। এবার বীণা দাসের কথা বলি। তিনি বিপ্লবী ছিলেন। কংগ্রেস দলে থেকেও মনে করেছিলেন যে, আবদ্ধ নিবেদনের নীতির পথে যাওয়ার থেকে বিপ্লবের পথে যাওয়া ভাল। ১৯৫০ সালে তিনিও বিধানসভায় নির্বাচিত হন। যেমন মণিকুন্তলা সেন তো অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে চলে আসেন। তিনি বিধানসভায় খুব সবাক ছিলেন। এখনও নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার নিয়ে তাঁর বক্তৃতাগুলি স্মরণীয়। ভোটের সময়ও। তিনি যখন বক্তৃতা দিতেন, তখন মেয়েদের কথা বারবার বলতেন। মেয়েদের যদি এগিয়ে নিয়ে না যাওয়া যায় তবে দেশ এগবে না। তবে মণিকুন্তলা সেন ছিলেন কমিউনিস্ট। তিনি চেয়েছিলেন, গোটা দেশে সাম্যবাদ আসুক। বড়লোক গরিব লোকের বিভাজন মিটে যাক। এক একজন নারী নেত্রী একেকভাবে সমাজ বদলাতে চেয়েছেন।
যেমন পূরবী মুখোপাধ্যায় চিরকাল কংগ্রেসের নেত্রী ছিলেন। তিনি ’৫১ সাল থেকে ’৫৭ সাল কংগ্রেসের নেত্রী হিসেবে বিপ্লব করে সমাজ বদলে না-দিয়ে এই সমাজব্যবস্থায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বক্তৃতা দিতেন। যেমন ১৯৫০ সালের প্রথমদিকে আভা মাইতি কংগ্রেসের এমএলএ হয়েছিলেন। তিনি নির্বাচনের সময় একবার জিপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রচার করেছিলেন। অনেকে বলেন, তিনিই প্রথম এরকম জিপে চেপে প্রচার শুরু করেছিলেন। তবে এগুলো সবই এখন ‘মিথ’ তৈরির কাহিনি বলে মনে হয়। কোনও ঘটনা সত্যি, কোনও ঘটনা অসত্য। সেদিন তো আজকের দিনের মত গুগ্ল ছিল না। সে অর্থে কোনওকিছু এভাবে নথিভুক্ত ছিল না। মোদ্দা জিনিসগুলি ইতিহাসের পাতায় থাকলেও এত খুঁটিনাটি প্রচারের ধারার কোনও ভিজ্যুয়াল রেকর্ড নেই। মাঝেমাঝে মনে হয়, আহা! আজকের মতো সেদিনও যদি ভিডিও ক্লিপিং পাওয়া যেত, তাহলে কেমন হত?
আমার কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরের চালক বাড়ি ফেরার সময় বললেন, ‘‘আপনি ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন?’’ আমি বললাম, ‘‘না। কেন বলুন তো?’’ ‘‘তাহলে চলুন না, আমরা একবার গীতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও দেখা করেনি।’’ পাঁশকুড়ার এমএলএ। যখনই পাঁশকুড়াতে যেতেন তখনই মানুষের ঢল নামত। বিধানসভার একজন সদস্য যিনি ভারতীয় ব্যবস্থায় একটা নির্বাচনী এলাকায়, যাকে বলে একটা আসন, সেখান থেকে রাজ্যের আইনসভায় ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হন। প্রত্যেক আসন থেকে জনগণ একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। তার জন্য লড়াই হয়। এখন যেরকমভাবে রক্তারক্তি হচ্ছে তখন সেরকম হত না। লড়াই সংঘাত হয়েছে। প্রত্যেক রাজ্য থেকে সেসময় অনেক বিধায়ক নির্বাচিত হতেন। রাজ্য বিধানসভায় আসতেন।
জন্মেছিলেন ১৯২৪ সালে। চারবার পাঁশকুড়া পূর্ব থেকে এমএলএ (১৯৬৭-১৯৭৭)। আবার সংসদেও তিনি গেলেন সাতবার। চাট্টিখানি ব্যাপার নয়! কত ভোট লড়েছেন। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি তারপর সিপিআইএমের তিনি নেত্রী ছিলেন। ‘ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান উইমেন’-এর সভানেত্রী। সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিলের জন্য যে লড়াই, সে লড়াই তিনি কিছু কম করেননি। ’৬৭ সালে তিনি যখন এমএলএ হন তখন ওই আসনে ছিলেন রজনীকান্ত প্রামাণিক। আগে তিনি ছিলেন গীতা রায়চৌধুরী। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করে তিনি হলেন গীতা মুখোপাধ্যায়।
দেখুন, ওই রকম ডাকাবুকো বিপ্লবী নেত্রী বিয়ের পর পদবি বদল করে মুখোপাধ্যায় হয়েছিলেন। ’৭৬ বছর বয়সে তিনি বিদায় নিলেন আমাদের কাছ থেকে। অনেকদিন ধরে রাজনীতি করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির সমালোচনা করতেন, বিরোধিতা করতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অসাধারণ। রাজধানী এক্সপ্রেসে যেতে যেতে গীতা মুখোপাধ্যায়ের গান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুনছেন। আবার গীতা মুখোপাধ্যায় মমতাকে গান গাইতে বলছেন। এ দৃশ্য অনেকবার দেখা গিয়েছে। এমনকী, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ২৫ বৈশাখ পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে রবীন্দ্রনাথের ছবির সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গীতা মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এসে রবীন্দ্র জয়ন্তী করেছেন। সেখানে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি কখনও হিংসা উদ্বেগকারী আবহাওয়া তৈরি করেনি।
সময় বদলে যায়। সব কিছুই বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের নারীশক্তির রথ কিন্তু থামেনি। আশা করি, থামবে না।