সকালে ভোট দিতে বেরিয়েছিলেন সোমেশ সাঁতরা। গরম পড়েছে। দুপুরে চড়া রোদ উঠবে। তাই আগেভাগেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা সেরে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে ভোট দিতে বেরিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। কোনও অশান্তি নেই, স্লোগানিং নেই, বাইক বাহিনীর তাণ্ডব নেই। বলেই ফেললেন, ‘এমন শান্তি পূর্ণ ভোট শেষ কবে হয়েছে মনে করতে পারছি না।’ আসলে গত কয়েকটি ভোটে কী না দেখেনি নন্দীগ্রাম (Nandigram)। বয়ালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (CM Mamata Banerjee) চোট পাওয়ার ঘটনাও এখানেই। আবার ভোটের দিন বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠীর হুঙ্কার, ‘খাকি পরে দাগ নেব না।’ সেটাও মুখ্যমন্ত্রীর চোখে চোখ রেখে। সেখানে এই নন্দীগ্রাম, মেলাতে পারছেন সোমেশ।
২০২১ এবং ২০২৪-এ ভোট পরবর্তী হিংসায় নন্দীগ্রামের ‘বদনাম’ হয়েছে বিস্তর। এ বার যেন সেই বদনাম ঘোচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হলদি নদীর পাশের শহর। নন্দীগ্রাম-১ নম্বর ব্লকের ভোটকেন্দ্রে বসে মুড়ি খাচ্ছিলেন বিজেপির মহিলা কর্মীরা। এই বুথটা মহিলা পরিচালিত। ভোট দিতে এসে ডাঁই করে রাখা খবরের কাগজের উপর থেকে এক খাবলা করে মুড়ি নিয়ে গেলেন ভোটারদের অনেকেই। যেন অকাল পিননিক হচ্ছে।
এই দু’টি খণ্ডচিত্র থেকে বোঝা যায়, নন্দীগ্রামের ভোটের সাতকাহন। তবে একেবারে শান্তিপূর্ণ ভোট হলো সে কথা বোধহয় বলা যাবে না। বিজেপি-তৃণমূলের হাতাহাতি, লাঠালাঠির অভিযোগ উঠল। আঙুল উঠল কেন্দ্রীয় বাহিনীর দিকেও। তবে যা হলো তা সামান্যই।
সাতসকালে নন্দীগ্রামের ভোটের সুরটা বেঁধে দিয়েছিলেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীই। ‘শান্তিকুঞ্জ’ থেকে বেরিয়েই বলে দিয়েছিলেন, ‘পরিবর্তন চাই, পরিবর্তন আনুন।’ তার পরেই ই-রিকশায় চেপে চলে যান ভোট দিতে। ৭৯ নম্বর বুথের নন্দনায়কবাড় প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁর কেন্দ্র। সেখানে ভোটারদের সঙ্গে একেবারে বাড়ির ছেলের মেজাজে প্রায় আধঘণ্টা ‘আড্ডা’ দেন। তার পরে ঢোকে দেন ভোট দিতে। শুভেন্দুর মতোই সকালে ভোট দিয়েছেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করও। শম্ভুনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেন তিনি।
ভোট দেওয়ার পরেই শুভেন্দু ঘাঁটি গাড়েন নন্দীগ্রামের বিজেপি কার্যালয়ে। পবিত্রও তাই। ফোনে দলীয় কর্মীদের সমস্যার কথা শোনেন। ফোনেই সমাধান করেন। বিকেল নাগাদ আবার গাড়িতে বের হন বুথ পরিদর্শনে। নির্বাচন কমিশন আর বিজেপিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। সোজাসুজি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী ঠিক কার হয়ে কাজ করছে বুঝতে পারলাম না।’ এ কথা বলার অবশ্য কারণটা কী?
বিজেপি নেতারা নাকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়িতে করে ঘুরছেন। এ দিন সকাল থেকেই এমন অভিযোগ বার বার উঠেছে। বেশ কিছু ভিডিয়ো (সত্যতা যাচাই করেনি এই সময় অনলাইন) ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহনীর গাড়িতে নন্দীগ্রাম ঘুরছিলেন বিজেপি নেতা গৌরহরি দাস। শুধু তাই নয়, কালীচরণপুরে ২৩৭ নম্বর বুথ থেকে বেছে বেছে তৃণমূল কর্মীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নন্দীগ্রামের ভোটে ‘আপারহ্যান্ড’ নিয়েছে কে? এখনই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তবে একাধিক জায়গায় বিজেপির বিরুদ্ধে মারধর, ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে তৃণমূল। গোড়ামাহালের জোড়াফুলের প্রার্থী চন্দন মণ্ডলকে দেখেই ‘চোর, চোর’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে। অবশ্য বিজেপির অভিযোগ, চন্দন সাধারণ মানুষকে তৃণমূলে ভোট দেওয়ার জন্য জোর করছিলেন। তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য বলছেন, ‘বাজে কথা।’
নন্দীগ্রামে এ বার বিজেপির পতাকার থেকে গেরুয়া পতাকা (ধর্মীয়) বেশি। চণ্ডীপুর ছাড়িয়ে নন্দীগ্রামে ঢুকলেই ছবিটা মালুম হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে যেন মন্দির শহর।’ হিন্দুত্বে শান দিয়েছেন শুভেন্দু নিজেও। সরাসরি বলে দিয়েছেন, ‘হিন্দুরা শঙ্কিত। এরা আবার ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের বাঁচতে দেবে না।’
ভোটের একেবারে শেষ লগ্নে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল নন্দীগ্রাম। জেলেমারার ৩৭ নং বুথে ভেকুটিয়া ১ অঞ্চলের তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি রাখহরি ঘড়াকে ব্যাপক মারধরের অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে। তিনি ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। অভিযোগ, সেই সময়ে বিজেপি কর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করেন। নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অবশ্য বিজেপির পাল্টা দাবি, ‘রাখহরি বাড়ি থেকে লাঠি নিয়ে বেরিয়েছিলেন। আমরা রুখে দিয়েছি।’ নন্দীগ্রাম ১ নং ব্লকের ISF প্রার্থী সবেমিরাজ খানকে তৃণমূল কর্মীরা হেনস্থা করেন বলে অভিযোগ। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব।
নন্দীগ্রামে ২০০৭-এর জমি আন্দোলন আজ ইতিহাস। তার পর হলদি নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। এক সময়ের বাম ঘাঁটিতে তৃণমূল ফুল ফুটিয়েছে। তার পরে এলাকার দখল নিয়েছে বিজেপি। ছাব্বিশের ভোটে নতুন ইতিহাস লেখার পালা।