প্রথম দফায় ভোটের হারে রেকর্ড। নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা অবধি যে হিসাব দিয়েছে, তাতে ভোট পড়েছে ৯২.১০ শতাংশ। ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই ২০২১-এর বিধানসভা বা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ভোটদানের হারকে অনেকটা ছাপিয়ে গিয়েছে প্রথম দফার ভোটের হার। ২০২১ সালে ভোট পড়েছিল ৮৩.২ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৭৯.৮ শতাংশ। এ বার বিকেল ৫টার মধ্যেই সেই হার ছাপিয়ে ৮৯.৯৩ শতাংশ হয়ে গেল। ভোটদানের হার আরও বাড়বে। আগামী বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে আজকের ভোটের হারের কাছাকাছি শতাংশ বজায় থাকলেই, ভোটদানে নতুন নজির গড়বে পশ্চিমবঙ্গ।
দেশে ভোটদানের হারের নিরিখে সব রাজ্যের মধ্যে এখনও পর্যন্ত সর্বকালীন রেকর্ড অসমের। চলতি বিধানসভা ভোটে সেখানে ভোট পড়েছে ৮৫.৩৮ শতাংশ। ভোটদানের রেকর্ডে দেশের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে এখনও পর্যন্ত শীর্ষে পুদুচেরি। অসমকে পিছনে ফেলে সেই নজির তারা গড়েছিল চলতি বিধানসভা নির্বাচনেই। পুদুচেরিতে ভোটদানের হার ছিল চলতি বিধানসভা নির্বাচনে ৮৯.৯৩ শতাংশ। তাদের পিছনে ফেলল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট। তবে চলতি বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে মোট ভোটদান কত হবে, সেই হার নজির গড়বে কি না, তা জানা যাবে দ্বিতীয় দফার পরেই। ফলে এ সব কাটাছেঁড়া এখনই করার সময় আসেনি।
তবে এই ভোটের হার নিয়ে দিকে দিকে আলোচনা কিন্তু শুরু। নানা মুনির নানা মত। যাঁরা রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণে পোড়খাওয়া, তারা অনেকে অনেক কিছুই বলছেন। কেউ বলছেন, হাওয়া ঘুরছে। কেউ বলছেন, মানুষ ভরসা রেখেছেন নির্বাচন কমিশনের ভোট পরিচালনায়। সাঁজোয়া গাড়ি, কোম্পানি কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী, পুলিশে ছয়লাপ ভোটকেন্দ্র, কড়া হাতে ‘ভোটের শত্রু’দের শায়েস্তা করা— মানুষকে বুথে টেনেছে।
অনেকে বলছেন, শুধুমাত্র ভোট দেবেন বলে রেকর্ড সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফিরেছে এ বার। এমনকী দেশের বাইরে থাকেন, এমন ভোটারও ফিরেছেন ভোটের টানে। তবে ভোটের এ হেন পাগলপারা হারকে আমজনতা ব্যাখ্যা করছেন একটু অন্য ভাবেই। বলছেন, ‘ভোট না দিলে যদি পরে আবার নাম কেটে দেয়!’
SIR-এ প্রায় ২৭ লক্ষ বিচারাধীন নাম বাদ গিয়েছে। ট্রাইব্যুনালে গিয়ে এখনও অবধি শ’খানেক মানুষ নাম তুলতে পেরেছেন। এখনও রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতো করে NRC-র লাভ-ক্ষতি বোঝাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ বুঝে গিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলি যে অঙ্কই বোঝাক, এ অঙ্কে ভাগফল মিলবে নাকি ভাগশেষই অবশেষ, কেউ জানে না। ফলে SIR-এর পরীক্ষায় যাঁরা পাশ করেছেন, যে যেখানেই থাকুন, ভোটটা দিতেই হবে।
যে ভোটার বাড়ির বাইরে থাকেন, বাড়ি থেকে বলা হয়েছে, ‘এলাকায় আলোচনা হচ্ছে এ বার ভোট না দিলে, নাম বাদ দিয়ে দেবে। যে ভাবেই হোক ভোটটা দিয়ে যাস।’ ভোট এ বার দিতেই হবে, বহু ভোটারের মধ্যে সেই বিষয়টি কাজ করেছে।
ভোটের এই রেকর্ড হারের প্রাথমিক কারণ হিসেবে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। SIR-এ বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। আগের বারের তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কমেছে। ফলে ভোটের শতাংশও বেড়েছে।
অর্থাৎ এর আগের ভোটার তালিকা অনুযায়ী যত জন ভোটার ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বাইরে থাকেন অথবা বেচে নেই। ফলে তাঁদের ভোট পড়ত না। সে ক্ষেত্রে তালিকায় থাকা ভোটার সংখ্যার নিরিখে প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার যা থাকতো, এ বার SIR-এর পরে তাতে বদল এসেছে।
এ বার SIR-এর পরে মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ গিয়েছে তালিকা থেকে। ফলে মোট ভোটারের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু যাঁরা ভোট দিয়ে এসেছেন, তাঁরা ভোট এ বারও দিয়েছেন। ফলে তালিকায় থাকা ভোটারের নিরিখে প্রদত্ত ভোটের শতকার হার গতবারের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা। যদিও নাম বাদ যাওয়ার তালিকায় যোগ্য ভোটাররাও রয়েছেন বলেও একাংশের দাবি। তবে এ হারে ভোট বৃদ্ধিতে SIR-ই যে অনুঘটক, সিংহভাগই তা মানছেন।