— কী রকম ভোট? কত পার্সেন্ট হলো?
— আরও তাড়াতাড়ি করো। হাত চালাও।
— তাড়াতাড়ি করে নাও। ব্যাপক লিড চাই।
— অন্য দলের এজেন্টরা আছে? না নাই?
— আচ্ছা আচ্ছা। যাক যাক...
স্থান: বোলপুরের তৃণমূল কার্যালয়। কাল: ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। পাত্র: অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট। ফোনে কথোপকথনের এই বিবরণে সে দিন শুধু একপ্রান্তেরই উবাচ শোনা গিয়েছিল। সেটি কেষ্টর। তবে অপর প্রান্তে তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামী কী উত্তর দিয়েছিলেন, তা আন্দাজ করা খুব একটা কঠিন নয়। ভোটের দিন অনুব্রতের গতিবিধি কেমন থাকে, তিনি কতটা সক্রিয় হন, তা বুঝতে সম্ভবত এই কথোপকথনই যথেষ্ট ছিল এত দিন। কিন্তু বৃহস্পতিবার কেষ্ট ধরা দিলেন সম্পূর্ণ অন্য অবতারে! সারা দিন অন্তরালে কাটালেন। লোকচক্ষুর আড়ালে বোলপুরের সেই তৃণমূল কার্যালয়েই ‘বন্দি’ হয়ে রইলেন তিনি। আর গোটা সময় জুড়ে তাঁকে ঘিরে থাকলেন জনাপাঁচেক অনুগামী।
বৃহস্পতিবার সকালে মেয়ে সুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে বোলপুরের ভগবতী নিম্নবুনিয়াদি বিদ্যালয়ে ভোট দিতে গিয়েছিলেন অনুব্রত। পরনে ছিল সাদা পাজামা, সাদা কুর্তা। চোখে চশমা। গোঁফ আর মাথার চুল দুইই কেয়ারি করা। সুকন্যার পরনেও ছিল সাদা চুড়িদার। বাবা-কন্যা দু’জনেই একসঙ্গে ভোট দেন। পরে ভোটকেন্দ্রের বাইরে বেরিয়ে একগাল হেসে কেষ্ট বললে, ‘ভোট দিলাম। খুব ভালো লাগল। আপনারাও সুষ্ঠু ভাবে ভোট দিন।’ বিরোধীদের উদ্দেশে কোনও হুঙ্কার নেই, মেজাজ হারানো নেই। ঠান্ডা গলায় হাসিমুখে কেষ্ট শুধু বলেছিলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন চেয়েছিলেন, বাংলায় তেমনই শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে।’ পরে ভোট শেষে দাবি করেছেন, ‘যা হারে ভোট পড়েছে, তাতে প্রথম দফার ১৫২টা আসনের মধ্যে বিজেপি খুব বেশি হলে ১৫-১৬টা পাবে।’
ভোট দেওয়ার পরে সোজা বোলপুরের পার্টি অফিসে চলে গিয়েছিলেন কেষ্ট। তার পর আর তাঁকে বাইরে দেখা যায়নি। ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সারা দিনই পার্টি অফিসে নিজের ঘরে ছিলেন কেষ্ট। সেখানে তাঁর সঙ্গে খুব বেশি হলে পাঁচ জন ছিলেন। অন্যান্য বার অন্তত জনা তিরিশেক কর্মী-সমর্থক তাঁকে ঘিরে থাকতেন। তাঁদের মাঝে থেকেই ‘ভোট পরিচালনা’ করতেন তিনি। লাগাতার ফোন করতেন অনুগামীদের। খোঁজ নিতেন। কোথায় কেমন ভোট হচ্ছে, তা জানতে চাইতেন। প্রয়োজনে নির্দেশ দিতেন। কোথায় কী ভাবে ভোট ‘করাতে’ হবে, তা-ও বলে দিতেন। কখনও কখনও নিজেই বেরিয়ে পড়তেন। ঘুরে বেড়াতেন বুথে বুথে। কিন্তু বৃহস্পতিবার অনুব্রতের পার্টি অফিসে যে ‘বন্দি’ ছবি ধরা পড়ল, তা একেবারে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে অনুব্রতকে নজরবন্দি করার নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই মতো সে দিনও বোলপুরের দলীয় কার্যালয়েই বন্দি ছিলেন কেষ্ট। কিন্তু তাঁকে আটকানো যায়নি। ‘ইনডোর গেম’ খেলেই বাজিমাত করেছিলেন তিনি। যা করার, করেছিলেন ফোনে ফোনে। সে বার বীরভূমের ১১টি আসনের মধ্যে ১০টিতেই জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু এ বার কেষ্টকে নজরবন্দি না করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। কিন্তু তার পরেও বুথে বুথে ঘুরে বেড়ানো তো দূর, বৃহস্পতিবার কেষ্টর ফোনও অন্যান্য বারের তুলনায় নিষ্ক্রিয় রইল! মাঝে দুপুরের দিকে কয়েক জন সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়েছিলেন অনুব্রত। মেরেকেটে আধঘণ্টার মতো তাঁদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে একবারও তাঁর ফোন বেজে ওঠেনি! ভোটের দিনে যা একেবারে ‘কেষ্টসুলভ’ নয় বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে এই বদল যে খুব আকস্মিক, তা-ও নয়। ভোটপ্রচারের সময় থেকেই তা অনেকের নজরে এসেছে। চেহারায় এক। কিন্তু চরিত্রে আলাদা। হাঁকডাক, হম্বিতম্বি ছিল না। ‘গুড়-বাতাসা‘, ‘নকুলদানা‘, ‘চড়াম চড়াম ঢাক বাজানো‘, ‘ভ্যানিশ‘ করে দেওয়ার হুমকিও ছিল না। ছিল আবদার হিসেবে ভোট চাওয়া। আর গলা যতটা সম্ভব মিহি করে জনসভায় ক্ষমা চাওয়া। টুকটাক কড়া কথা বলেছেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মিছরি ঢেলেছেন ভাষণে। আড়ালে-আবডালে দলীয় কর্মী-সমর্থকেরাও বলতে শুরু করেছিলেন, তিহাড় ফেরত অনুব্রত যেন মিয়োনো মুড়ির মতো! তবে তাঁদের ধারণা ছিল, ভোটের দিন কেষ্টকে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই দেখা যাবে। কিন্তু কোথায় কী! অনুগামীদের সেই প্রত্যাশা পূরণ তো হলোই না। উল্টে আগের তিন বিধানসভা ভোটের অনুব্রতের সঙ্গে এ বার অনুব্রতের চরিত্রে কতটা অমিল রয়েছে, তারই হিসেবনিকেশ করতে বসেছেন দলীয় কর্মী-সমর্থকদের একাংশ।
প্রসঙ্গত, গরু পাচার মামলায় ২০২২ সালের অগস্টে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কেষ্ট। এর পর তাঁর ঠাঁই হয় দিল্লির তিহাড় জেলে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে তিহাড় থেকে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু জেলায় ফেরার পর থেকেই দাপট কমেছিল অনুব্রতের। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের দাবি, অনুব্রতের অনুপস্থিতিতে তাঁর রাজনৈতিক জমির অনেকটাই দখল করে নিয়েছেন নানুরের কাজল শেখ (ভোটে হাসনের তৃণমূল প্রার্থী)। সেই হারানো জমি আর পুনরুদ্ধার করতে পারেননি কেষ্ট। তার বড় কারণ জেলায় দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বদল এসেছে। যতবারই কেষ্ট-কাজলের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে, শীর্ষ নেতৃত্ব হস্তক্ষেপ করেছেন। ফলে অনেক কিছুই যে আর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা বিলক্ষণ জানেন কেষ্ট। কেষ্টর চরিত্র বদল তারই পরিণতি।
তবে পাল্টা অভিমতও রয়েছে। অনুব্রতের ঘনিষ্ঠমহলের বক্তব্য, কেষ্ট শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশেই যা করার করছেন। এ বারের ভোট তাঁর কাছে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। তিনি যে ফুরিয়ে যাননি, সে কথা দলকে বোঝানোর লড়াই। এ বারের ভোটে কোথাও কোনও ঝুঁকি নিতে না চাওয়া দলনেত্রী বা সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অনুব্রতের পুরনো ক্যারিশমা যতটুকু ব্যবহার করা যায়, তার সবটাই করার চেষ্টা করেছেন। জেলাকে যে অনুব্রত হাতের তালুর মতো চেনেন, সে কথা এ বারেও প্রচারে উল্লেখ করেছেন মমতা। অনুব্রত ‘দিদি’র নির্দেশ মেনেই চলেছেন এ বারের ভোটে।