সমীর মণ্ডল, মেদিনীপুর
বহু বছরের রাজনৈতিক অশান্তি আর সংঘর্ষের ইতিহাসের পট পরিবর্তন ঘটল। এ বারের নির্বাচনে অন্য ভোট দেখলেন কেশপুরের মানুষ। তাঁরা দেখলেন না বোমা-গুলির পরিচিত ছবি। নেই হুমকি, দখলদারি বা প্রার্থীকে ঘিরে বিক্ষোভ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারির মোড়কে কেশপুরের অশান্তির ইতিহাস এদিন ছিল অদৃশ্য। যা দেখে কেশপুরবাসীর অনেককেই বিস্ময়ে বলতে শোনা গিয়েছে, 'নজিরবিহীন অভিজ্ঞতা'।
নির্বাচন মানেই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসত কেশপুরের নাম। হিংসা, বুথদখল, প্রার্থীদের উপর হামলা কিংবা ভোটারদের ভয় দেখানোর ঘটনা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ছিল এখানকার ভোটে। কিন্তু এ বার সেই চেনা ছবিটাই দেখা যায়নি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের কোনও অশান্তির খবর তো মেলেইনি। বুথের বাইরে অযথা ভিড় বা রাজনৈতিক কর্মীদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও চোখে পড়েনি বৃহস্পতিবার।
এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা। কেশপুরের একাধিক স্পর্শকাতর এলাকা যেমন মুগবসান, বাজুয়াড়া, দোগাছিয়া, ছুতারগেড়িয়া বা মহিযাগেড়্যায় কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। কোথাও কেউ জটলা করার চেষ্টা করলেই সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করেছে বাহিনী এবং কিউআরটি-র (কুইক রেসপন্স টিম) টিম। ফলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। স্থানীয়দের মতে, এমন শান্তিপূর্ণ ভোট কেশপুরে খুব কমই দেখা গিয়েছে। কলাগ্রাম বাজারের এক বাসিন্দা বলেন, 'ভোটের দিন কোনও গোলমাল হয়নি, এটা আমাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।' উচাহার গ্রামের গিয়াসুদ্দিন মল্লিকের কথায়, 'এ ভাবে ভোট কেশপুরে বিরল।'
রাজনৈতিক মহলেও এই পরিবর্তন নিয়ে বিস্ময় ও সন্তোষ দেখা গিয়েছে। তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সহা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কৃতিত্ব দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে। তাঁর বক্তব্য, 'মানুষ চেয়েছেন বলেই শান্তিতে ভোট হয়েছে।' অন্য দিকে বিজেপি নেতা তন্ময় ঘোষও স্বীকার করেছেন, 'মানুষ অন্তত নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছে।' আর সিপিএম নেতাদের কথায়, 'এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তাঁদের সময়েও খুব একটা দেখা যায়নি।'
আশ্বাস যে বাস্তবে রূপ পেল, তা স্পষ্ট এ বারের ভোটচিত্রে। কদিন আগে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার আবেদন নিয়ে কেশপুরে বাজারে পদযাত্রা করেন জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা, পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিক ও জওয়ানরা। কেশপুরবাশীর উদ্দেশে সেদিন পুলিশ সুপারের বার্তা ছিল, 'কেশপুরে শান্তিপূর্ণ নির্বাচণ করে আমরা রাজ্যে নজির গড়ব।' এ দিন ভোটপর্ব মেটার পর কেশপুরের অনেকেই বলতে শোনা গিয়েছে, 'প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে সব সম্ভব'।