• নকল EVM, মারধর, বিক্ষিপ্ত অশান্তি তিন জেলায়
    এই সময় | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: প্রথম দফার নির্বাচন শান্তিতে কাটলেও বৃহস্পতিবার ভোটের দিন তিন জেলাতেই ভোটকে কেন্দ্র করে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতে এদিন ভোট প্রক্রিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল বলে জানাচ্ছেন ভোটাররা।

    মেদিনীপুর শহরের নারায়ণ বিদ্যাভবন এলাকায় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বচসা, কেশপুরের কয়েকটি বুথে এজেন্ট প্রবেশে বাধা, আবার কোথাও ইভিএম বিকলের মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। মেদিনীপুর শহরের এক প্রবীণ ভোটার বলেন, 'শুরুর দিকে একটু গোলমালের খবর শুনেছিলাম। কিন্তু আমাদের বুথে সব ঠিকঠাকই হয়েছে।' শালবনির এক যুব ভোটারের অভিজ্ঞতা, ইভিএমে একটু সমস্যা হয়েছিল। তাতে কিছুক্ষণ দেরি হয়। কিন্তু পরে ভোট প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলির তরফেও কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। সিপিএম অভিযোগ করেছে, কিছু এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোটার কার্ড ব্যবহার করে ভোট দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বিজেপির তরফেও কয়েকটি বুথে এজেন্টদের প্রবেশে বাধা ও ভোটারদের লাইনে সমস্যা তৈরির অভিযোগ তোলা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা মিটে যায়।

    পাঁশকুড়া পশ্চিমে তৃণমূলের বুথ ক্যাম্পে নকল ইভিএম দিয়ে ভোট প্রচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় গোবিন্দনগর এলাকায়। বিজেপি প্রার্থী সিন্টু সেনাপতিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূল। এদিন সকাল থেকে বিভিন্ন বুথে ঘুরেছিলেন পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিজেপি প্রার্থী সিন্টু। দুপুরে গোবিন্দনগর পঞ্চায়েত এলাকার বনমালীপুর ৫৮ নম্বর বুথে যান। সেখানে তৃণমূলের বুথ ক্যাম্পে নকল ইভিএম দিয়ে ভোট প্রচার করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ। সেখানে গেলে সিন্টুর সঙ্গে বচসায় জড়ান তৃণমূল কর্মীরা। সিন্টু বলেন, 'ভোটের দিন নকল ইভিএম দিয়ে ভোট প্রচারের নিয়ম নেই। তৃণমূল নিয়ম ভেঙে বুথ ক্যাম্পে নকল ইভিএম দিয়ে প্রচার চালাচ্ছিল। আমি বাধা দেওয়ায় আমার পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয় তৃণমূল কর্মীরা। বিষয়টি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে জানিয়েছি।'

    বনমালীপুর ৫৮ নম্বর বুথের তৃণমূল সভাপতি শেখ শাকিল আলি বলেন, 'বুথ ক্যাম্পে নকল ইভিএম ছিল। কিন্তু আমরা কাউকে সেটি দেখাইনি। বিজেপি আমাদের বুথ ক্যাম্পে ভাঙচুর চালিয়েছে।' পাঁশকুড়া পশ্চিমের মাইশোরায় পাতন্দা ২১ নম্বর বুথের তৃণমূল এজেন্ট গোপাল দূয়ারি এবং বিজেপি এজেন্ট গৌতম দত্তকে রাস্তা থেকে আটক করে কেন্দ্রীয় বাহিনী। দেড় ঘণ্টা পরে তাঁদের পাঁশকুড়া থানা থেকে ছাড়া হয়। ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই আটক বলে পুলিশ জানিয়েছে। নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার ২৭১ নম্বর বুথে এক তৃণমূল কর্মীর মাথা ফাটে।

    অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। ভোটের দিন সকালে ময়না বিধানসভায় বিভিন্ন বুথ পরিদর্শনে যান তৃণমূল প্রার্থী চন্দন মণ্ডল। গোড়ামাহাল এলাকার ২৩৪ নম্বর বুথের কাছে তিনি বিজেপি কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। অভিযোগ, তাঁকে ঘিরে 'চোর চোর' ও 'জয় শ্রী রাম" স্লোগান দিতে থাকেন বিজেপি সমর্থকেরা। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। চন্দনের অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। তাঁর প্রশ্ন, একজন প্রার্থীই যদি নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকলেও রাস্তায় টহলদারি যথেষ্ট ছিল না। বিষয়টি তিনি রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন। বিজেপি প্রার্থী অশোক দিন্দার দাবি, 'ময়নায় শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট হচ্ছিল। চন্দন ওই এলাকায় গিয়ে দাদাগিরি দেখিয়েছেন। স্থানীয় মহিলারা সরকারি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সেই ক্ষোভে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।'

    ময়না বিধানসভার দুটি বুথে সমস্ত দলের এজেন্টদের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে। সকাল দশটা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিজেপি প্রার্থী অশোক দিন্দা বিষয়টি রিটার্নিং অফিসারকে জানান। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আধ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়। জেলা শাসক নিরঞ্জন কুমার বলেন, 'বিভিন্ন মাধ্যমে বহু অভিযোগ জমা পড়েছিল। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।'

    কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারির মধ্যে কাঁথি পুরসভা এলাকার ২ নম্বর বুথে পোলিং এজেন্ট দিতে পারনি বিজেপি। বিজেপির অভিযোগ পোলিং এজেন্টকে মারধর করে বুথ থকে বের করে দিয়েছে তৃণমূল। বিজেপির কাঁথি সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সোমনাথ রায় বলেন, 'তৃণমূল মারধর করে আমাদের কয়েক জন এজেন্টকে বুথ থেকে বার করে দিয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। তৃণমূলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে মারধরের ঘটনা ঘটল। অথচ নির্বাচন কমিশন কোনও ব্যবস্থা নিল না। তৃণমূলের দাবি, শুধু কাঁথি পুরসভার এলাকার ১৩০ ও ১৩১ নম্বর বুথ নয়। গ্রামের ভিতরে অনেক বুথে এজেন্ট দিতে পারেনি বিজেপি।

    ভোটের আগের রাতে তৃণমূল এবং বিজেপির সংঘর্ষে মাথা ফাটে তৃণমূলের বর্তমান ও প্রাক্তন বুথ সভাপতির। নয়াগ্রাম বিধানসভার গোপীভল্লভপুর দুই ব্লকের কুলিয়ানা গ্রাম পঞ্চায়েতের পিঠাপুরা ও হাতিপাদা গ্রামের ঘটনা। জানা গিয়েছে, বুধবার দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে দুটি ঘটনা ঘটে। পিটাপুরা গ্রামে এক তৃণমূল কর্মী মোটরবাইকে যাওয়ার সময় রাস্তায় কুকুরকে ধাক্কা মারে বলে অভিযোগ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়।

    তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপির লোকজন বাঁশ, লাঠি নিয়ে তৃণমূল কর্মীদের উপর চড়াও হয়। ঘটনায় পিঠাপুরা বুথের বুথ সভাপতি রবীন্দ্রনাথ বালার মাথা ফেটে যায়। অন্যদিকে, হাতিপাদা গ্রামে তৃণমূলের পিকনিক হচ্ছিল বলে আভিযোগ বিজেপির। সেখানে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে গন্ডগোল বাধে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপির লোকজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাতিপাদা বুথের তৃণমূলের প্রাক্তন বুথ সভাপতি সুকুমার পালকে। কোপ মারে। তাঁর মাথার কিছুটা অংশ কেটে যায়।

    গোপীবল্লভপুর দু'নম্বর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি টিঙ্কু পাল বলেন, 'বিজেপির লোকজন হঠাৎ আমাদের বুথ সভাপতি ও প্রাক্তন বুথ সভাপতি উপর আক্রমণ চালায়। ঘটনায় একজনের মাথা ফাটে এবং অন্য জনের মাথার কিছু অংশ কেটে যায়। পুলিশে অভিযোগ জানানো হয়েছে।' নয়াগ্রাম বিজেপির পাঁচ নম্বর মণ্ডল সভাপতি তাপস সুই তৃণমূলের সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, 'তৃণমূল ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আমাদের কর্মীদের হয়রান করা হচ্ছে।' বুধবার রাতেই ঝাড়গ্রাম বিধানসভার সাপধরা অঞ্চলের ধুপকুড়ি গ্রামে ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য বেশ কয়েকজন জমায়েত করে বলে বিজেপির অভিযোগ। স্থানীয় বিজেপি কর্মী বিশ্বজিৎ মাহাতো প্রতিবাদ করলে তাঁকে লোহার রোড ও ধরালো অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়। বিজেপি কর্মীকে মারধরের ঘটনায় ঝাড়গ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ঝাড়গ্রামের বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত সাউ।

  • Link to this news (এই সময়)