• পার্টি অফিসে বসেই ভোট পরিচালনা অনুব্রতর, ১১ আসনে জেতার দাবি
    বর্তমান | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি ও সংবাদদাতা, বোলপুর: বীরভূমের ভোটে অনুব্রত মণ্ডল মানেই ছিল একসময়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে এক মস্ত ‘মাথাব্যথা’। ভোটের দিন মানেই তাঁকে নজরবন্দি করা আর তাঁর মুখ থেকে ‘চড়াম চড়াম’, ‘গুড়-বাতাসা’ কিংবা ‘নকুলদানা’র মতো হরেক বিতর্কিত দাওয়াইয়ের অপেক্ষায় থাকা। কিন্তু ২০২৬-এর এই বিধানসভা নির্বাচনে সেই চেনা ছবি দেখা গেল না। বৃহস্পতিবার বীরভূমের ভোট-ময়দানে দেখা মিলল এক ‘অন্য’ অনুব্রতর। যাঁর নামে একসময় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত সেই কেষ্টকে এবার নজরবন্দি করার প্রয়োজনই বোধ করল না কমিশন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তিহার জেল থেকে ঘুরে আসার পর বীরভূমের এই দাপুটে নেতার শরীরী ভাষা থেকে শুরু করে গলার স্বর-সবই এখন অনেক বেশি ‘নরম’। তবে, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছিলেন অনুব্রত। বীরভূমের ১১টি আসনের ১১টিতেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের সুর শোনা গেল তাঁর গলায়। 

    বৃহস্পতিবার সকালে বোলপুরের নিচুপট্টির বাড়ি থেকে যখন ভোট দিতে বেরলেন তখন সেই চেনা হুঙ্কার উধাও। বোলপুর ভগবত নিম্নবুনিয়াদি বিদ্যালয়ের বুথে যখন মেয়ে সুকন্যাকে পাশে নিয়ে তিনি ভোট দিতে ঢুকলেন,  তখন তাঁকে ঘিরে প্রবল উচ্ছ্বাস ছিল দলীয় কর্মী-সমর্থকদের। ২০২১-এর পর গরু পাচার মামলায় গ্রেপ্তারি, দীর্ঘ তিহারবাস এবং লোকসভা নির্বাচনে গরহাজির থাকার পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম ভোটদান। তবে তাঁর গলায় সেই চেনা ধমক আর শোনা যায়নি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে চিরাচরিত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘খুব সুন্দর ভোট হচ্ছে। তৃণমূল ২৩০টা আসন পাবে।’ কিন্তু ওই পর্যন্তই! 

    বোলপুরের আইসিকে গালিগালাজ কাণ্ডের পর থেকেই অনুব্রত যেন নিজেকে এক অদৃশ্য গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেছেন। আগে যেখানে বিরোধীদের হাড়-মাস এক করার নিদান দিতেন সেখানে এদিন এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের হয়রানি নিয়ে অনুযোগ করেই দায় সারলেন। বোলপুর থেকে সিউড়ি-জেলার আনাচে-কানাচে কান পাতলে এখন একটাই কথা শোনা যাচ্ছে, ‘কেষ্টদা আগের মতো নেই।’

    তবে মেজাজ নরম হলেও রাজনীতির চাল যে তিনি ভোলেননি তা বোঝা গেল বোলপুরের দলীয় কার্যালয়ে যাওয়ার পর। বীরভূমের ৪৩ জন নিচুতলার নেতাকে এবার কমিশন নজরবন্দি করলেও, স্বয়ং ‘কেষ্ট’ কিন্তু ছিলেন মুক্ত। পার্টি অফিসের সেই বন্ধ ঘরে বসে দিনভর ফোনের ওপারেই চলল তাঁর সেনাপতিত্ব। কখন কোন ব্লকে ভোট কমল, কোথায় বিরোধীরা মাথা তুলছে-সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। তবে তাঁর কন্ঠস্বরে আগের সেই দাপট কিংবা হুমকির বদলে ছিল অনেকটা ‘পরামর্শে’র সুর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনুব্রত এখন অনেক বেশি কৌশলী এবং সংযত। কমিশনের খাতায় এবার তাঁর নাম ‘বিপজ্জনক’ তালিকায় না থাকাটা একদিকে যেমন তাঁর স্বস্তির, অন্যদিকে জেলার রাজনীতিতে তাঁর একক আধিপত্যে কিছুটা ভাটার টান বলেও মনে করছেন বিরোধীরা।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনুব্রত এখন অনেক বেশি কৌশলী। প্রকাশ্যে হুঙ্কার না দিলেও পর্দার আড়ালে থেকে দলকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যে তিনি এখনও জেলার ‘শেষ কথা’, এদিন পার্টি অফিসে বসে তাঁর ভোট পরিচালনার ধরনই যেন তা আবারও স্পষ্ট করে দিল।
  • Link to this news (বর্তমান)