বুথে ছাউনি ও পানীয় জলের ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা
বর্তমান | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
বিধান গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গাপুর: বাইরে বৈশাখের অগ্নিবাণ, আর ভিতরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার যন্ত্রণা। প্রথম দফার নির্বাচনে ভোটারদের অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হল একরাশ ক্ষোভ আর ভোগান্তিতে। ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টা পেরতে না পেরতেই আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। অথচ ভোট কেন্দ্রে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ পালন করতে আসা সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যের বালাই নেই। না আছে পানীয় জলের ব্যবস্থা, না আছে মাথার উপর ছাউনি। ফলে গরমের অগ্নিবাণে দগ্ধ হয়ে, তপ্ত মাটির উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েই গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হতে বাধ্য হলেন ভোটাররা।
নির্বাচনের আগে কমিশনের নীল নকশায় প্রবীণ ভোটারদের সুরক্ষা সহ বড়ো বড়ো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদিন দুর্গাপুরের অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে একই চিত্র দেখা যায়। ১৫২ থেকে ১৫৬ নম্বর বুথ মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভোট কেন্দ্রের সামনে সকাল থেকেই লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। তাঁদের কারো হাতে লাঠি, কারো চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ভোটারদের জন্য ছিল না কোনো ছাউনি। ছিল না পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে তাঁরা বাধ্য হয়েছেন। যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ নয়, এ এক কঠিন সহ্য শক্তির পরীক্ষা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে বেনাচিতির ভোট কেন্দ্রেও দেখা যায় প্রচণ্ড তাপে হাঁসফাঁস করছেন ভোটাররা। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বিমল পতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ভোট দেওয়ার জন্য এই চাঁদিফাটা রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম ব্যবস্থা টুকুও করেনি। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সমীরকুমার দাস বলেন, দু’ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এই গরমে কোরো কিছু হলে তার দায় কি নির্বাচন কমিশন নেবে।
স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয় জোর রাজনৈতিক তরজা। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার তথা জেলা তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী অসীমা চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচন কমিশনের কোনো চৈতন্য নেই। আসলে নির্বাচন কমিশন এসআইআর করেও এ রাজ্যের মানুষের মনোবল ভাঙতে পারেনি। ভেবেছিল এই গরমে দীর্ঘক্ষণ মানুষকে দাঁড় করিয়ে রাখলে হয়তো তাঁরা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ না করেই বাড়ি ফিরে চলে যাবেন। কিন্তু, মানুষকে ধন্যবাদ তাঁরা তীব্র গরম উপেক্ষা করেই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
যদিও এ বিষয়ে সাংগঠনিক জেলা বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মণ্ডল বলেন, আসলে ভোট লুট করতে পারেনি বলে তৃণমূলের পেট ব্যথা করছে। তাই নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করছে।
শীততাপ নিয়ন্ত্রিত আস্তানা থেকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার যখন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন আর বিধি-নিষেধের জাঁতাকলে নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু’ প্রমাণে ব্যস্ত, তখন ভোটারদের মৌলিক অধিকার এবং শারীরিক সুরক্ষা যেন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা এই নির্বাচনে এক গ্লাস জল বা একটু ছায়া কি সত্যিই খুব মহার্ঘ ছিল? এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলছে, গণতন্ত্রের আসল স্তম্ভ কি তবে উপেক্ষিত?