• বাংলার লড়াই: আটপৌরে শাড়ি লড়ছে দশ লাখি স্যুটের বিরুদ্ধে
    বর্তমান | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • তন্ময় মল্লিক: না, লড়াইটা আর শুধু রাজনৈতিক নয়। হিন্দুত্বের ধুয়োয় ক্ষমতার ধ্বজাধারী এক ক্ষমতার উপাসকের সঙ্গে একাকী ‘যুদ্ধে’র ময়দানে রুখে দাঁড়ানো এক নারীর। ‘ফকির আমি, ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব’ বলে হাততালি কুড়িয়ে দশ লাখি স্যুট পরে ঘুরে বেড়ানো একটি দলের পোস্টার বয়ের সঙ্গে আটপৌরে শাড়ির। প্রতিশ্রুতির ঢক্কানিনাদের সঙ্গে বাস্তবের। আমরা ভারতবাসী। বাঙালি। মুখ দেখে আজও আমরা ভোট দিয়ে থাকি। ভরসা করি সেই নেতা বা নেত্রীকে, যাঁরা আমাদের কথা ভাববেন। সমস্যার সমাধান করবেন। তাই আজও বাংলার বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাস্তাঘাট, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, কন্যাশ্রী এবং অবশ্যই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য। কিন্তু ঠিক একই কারণে কি সংসদে নরেন্দ্র মোদি? গত ১২ বছরে কংগ্রেসের প্রকল্পের নাম পরিবর্তন ছাড়া আর ঠিক কী আমরা তাঁর থেকে পেয়েছি? আচ্ছে দিনের প্রতিশ্রুতি? বছরে ২ কোটি চাকরির আশ্বাস? চার ঘণ্টার নোটিসে নোট বাতিল? নাকি অপরিকল্পিত জিএসটি বা লকডাউন? এগুলোকে যদি ‘নতুন ভারতে’ প্রাপ্তি বলা যায়, তাহলে তার থেকে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু বিজেপির মুশকিল হল, বাংলা এই দুর্ভাগ্যের ফাঁদে পা দেয় না। তাই দশলাখি স্যুটের এত গোঁসা। ঠিক এই কারণেই বছরের পর বছর বঞ্চনা শুধু বাংলাকেই। এসআইআরের নামে ভোটারদের হয়রানি। তারপরও ‘রাষ্ট্রীয় মেশিনারি’ নামিয়ে বাংলা দখলের মরিয়া উদ্যোগ।

    হ্যাঁ, এটা লড়াই। শুধু ভোটের নয়। বেঁচে থাকার। অস্তিত্ব রক্ষার। বাংলার সংস্কৃতিকে বুক দিয়ে আগলানোর। ফটোশ্যুটের রাজনীতি এই রাজ্যের জন্য নয়। আগে ফটোগ্রাফার পজিশন নেবে, তারপর সেই ফ্রেম অনুযায়ী ‘অ্যাক্টো’ করবেন আমাদের মাননীয় বিশ্বগুরু! আমরা এতে অভ্যস্ত নই। এই বাংলার সিংহভাগ মানুষ আজও যার সঙ্গে সরাসরি নিজেকে কানেক্ট করতে পারে, সে হল একজোড়া হাওয়াইচটি। আর ওই যে... আটপৌরে শাড়ি। তিনি নিরাপত্তারক্ষীকে দু’দিন যাবৎ রেকি করান না, বা তারপর ১০ টাকা হাতে গুঁজে দেওয়ার অভিনয় করে ঝালমুড়ি খান না। ওই ভদ্রমহিলার সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত। আমরা এতেই অভ্যস্ত। নকলনবিশীতে নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৯৪ আসনে প্রার্থী... এটাই আমাদের মাথায় এবং মননে বসে গিয়েছে। আজ যদি শুনতে হয়, নরেন্দ্র মোদিও ২৯৪ আসনে প্রার্থী, তাহলে হয় হাসি পাবে, না হলে করুণা হবে। মোদিজি নিজেই কি এবার প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি ছেড়ে বাংলার মসনদে বসতে চান? যদি সেটা না হয়, আপনাকে দেখে বাংলা ভোট দেবে না!

    এটা অবশ্যই লড়াই। তবে ব্যক্তিত্বের। সাধু-ভণ্ড চিনে নেওয়ার। পঁচাত্তরেও বাহারি ম্যাচিং কোট-চশমা-জুতো, ১২ কোটির গাড়ি, ৮ হাজার কোটির বিমানের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লায় চাপানো নীল পাড়-সাদা শাড়ি। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে একজন গ্যাসের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। আর একজন সামাজিক প্রকল্পের টাকার অঙ্ক। একজন কর ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে কেড়ে নিচ্ছেন, আর একজন ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন পরিষেবা। প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব। একজনকে বোঝাতে হচ্ছে, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। আর একজন মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। এই সবই টুকরো টুকরো ছবি। বাংলা দেখছে। বুঝছে। আর সিদ্ধান্ত? সেটাই তো ভোট। গণতন্ত্রের মাটিতে স্বৈরতন্ত্রকে রুখে দেওয়ার সাহস। বাংলা পেরেছে। আগামীতেও পারবে।
  • Link to this news (বর্তমান)