তরুণ প্রজন্মের কাজের ছেলে, উন্নয়নের ভোটযুদ্ধে এবারও পাল্লা ভারী তৃণমূলের
বর্তমান | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: দেগঙ্গায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল। কদম্বগাছির দিক থেকে ঢুকতেই চোখে পড়ে ধানের সবুজ খেত। তার বুক চিরে চলে গিয়েছে পাকা রাস্তা। একসময় কাদা ভেঙে যেতে হতো এই পথ। এখন এই রাস্তা দিয়ে সহজেই চলে যাচ্ছে ভ্যান, বাইক। এই বদলের রেখা ধরেই এগয় দেগঙ্গার গল্প— মাটির উপর দাঁড়িয়ে, কিন্তু নতুন এক ছন্দে।
হাদিপুরে থামলে ছবিটা জলের। বড়ো পুকুরের ধারে জাল টানছেন কয়েকজন। দুপুরের রোদে জলে ঝিলিক পড়ছে, আর তার মাঝেই কাজের গতি। কৃষি আর মাছ চাষ— এই দু’য়ের উপরেই টিকে আছে এলাকার জীবনযাত্রা। তবে আগের সঙ্গে এখনকার ফারাকটা চোখে পড়ার মতো। বিদ্যুতের ধারাবাহিকতা বেড়েছে, কাজ থেমে থাকার সময় কমেছে— এই পরিবর্তনটা এখানকার মানুষ নিজের অভিজ্ঞতায় মেপে নিচ্ছেন। আর দেগঙ্গা বাজারে ঢুকতেই আবহ বদলে যায়। ভিড়, শব্দ, চায়ের দোকানে জমাট আড্ডা। সব মিলিয়ে ভোটের আসল তাপমাত্রা এখানে ধরা পড়ে। কিছুক্ষণ বসে থাকলেই বোঝা যায়, আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দু’টি বিষয়— কাজ আর সংগঠন। তৃণমূলের তরুণ প্রার্থী আনিসুর রহমানকে নিয়ে কৌতূহল আছে। কিন্তু তার থেকেও বড়ো হয়ে উঠেছে তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি হিসাবে এলাকায় ঘোরাঘুরি, মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ— এই ‘চেনা মুখ’ ইমেজটাই এখানে বড়ো ফ্যাক্টর। বেড়াচাঁপায় বিকাল নামতেই একে একে জ্বলে ওঠে স্ট্রিট লাইট। আলো পড়ে পাকা রাস্তায়, পাশ দিয়ে চলে যায় বাইক। অন্ধকার নামার আগেই আলো তৈরি— এই দৃশ্যটাই যেন গত কয়েক বছরের উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি। দমকল কেন্দ্র, বিদ্যুতের উন্নত পরিষেবা, সব মিলিয়ে এলাকায় একটা স্থিরতার আবহ তৈরি হয়েছে, যা ভোটের মেজাজে প্রভাব ফেলছে।
সোহাইয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা গড়াল। উঠোনে, মোড়ে, দোকানের সামনে ছোটো ছোটো আড্ডা। বাইরে থেকে দেখলে লড়াই আছে। বিজেপির তরুণকান্তি ঘোষ, আইএসএফের মফিদুল হক সাহাজি (মিন্টু সাহাজি) মাঠে রয়েছেন। কিন্তু দিনভর ঘুরে একটা বিষয় পরিষ্কার হল, সংগঠন আর মাটির সংযোগই হল আসল কথা। এই ফারাকটাই বড়ো হয়ে উঠছে। এলাকার মানুষও এই কথা বলছেন। কদম্বগাছির নিয়ামত খান বললেন, ছেলেটা ছোটো হলেও চিনি। কাজ করেছে, এইটাই ভরসা। হাদিপুরের মাছচাষি সুরজ মণ্ডলের বক্তব্য, মানুষ সুবিধা পেয়েছে, সেটা ভুলবে কী করে! দেগঙ্গা বাজারের ব্যবসায়ী কৃপাসিন্ধু দাসের পর্যবেক্ষণ, লড়াই আছে ঠিকই, কিন্তু নীচুস্তরে ফারাকটা বোঝা যায়। তবে দেগঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় মিন্টু সাহাজিকে ঘিরে আবার অন্য প্রতিক্রিয়াও উঠে এসেছে। একসময় তৃণমূলের সঙ্গে ছিলেন তিনি। এখনও তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য শাসকদলের সক্রিয় কর্মী। এই দ্বৈত অবস্থান অনেকে মেনে নিতে পারছে না। বেড়াচাঁপার প্রবীণ বাসিন্দা শ্যামল দাঁয়ের কথায়, পরিবার একদিকে, উনি আরেকদিকে। এটা মানুষ সহজে নেয় না। সোহাইয়ের এক যুবক আরও স্পষ্ট, ঘরের ভিত তৃণমূলেই, বাইরে লড়াই— এতে বিশ্বাস জমে না। এই মনোভাব আইএসএফ প্রার্থীর পথকে কঠিন করে তুলেছে বলেই ইঙ্গিত।
এনিয়ে তৃণমূল প্রার্থীর জবাব, আমি এখানে কেউ না। মানুষ আমার উপর আস্থা রাখছেন। বিধায়ক হওয়ার পর এই ঋণ শোধ করব। কাজকে আমি ভয় পাই না। উন্নয়নই এখানে শেষ কথা বলবে। পালটা আইএসএফ প্রার্থী মফিদুল হক সাহাজি বলছেন, তৃণমূলের যদি এত আত্মবিশ্বাস, তাহলে এত লম্ফঝম্ফ করার কী আছে? আসলে ভয়ে পেয়েছে ওরা। মানুষ ওদের জবাব দেবেন। একইসুরে বিজেপির তরুণকান্তি ঘোষ বলেন, এবার দেগঙ্গায় পদ্মফুল ফুটবে।
সব মিলিয়ে দেগঙ্গার ছবিটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। এখানে উত্তেজনার চেয়ে নিশ্চয়তার সুরই বেশি। পাকা রাস্তা, আলো, দমকল কেন্দ্র, বিদ্যুৎ— উন্নয়নের দৃশ্যমান ছাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণ প্রার্থী আর মজবুত সংগঠন। মাঠে ঘুরে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে যে বার্তা উঠে আসে, তা একদিকে ঝুঁকে। দেগঙ্গায় তৃণমূলই এগিয়ে, এই ধারণা সিংহভাগ মানুষের।