প্রীতেশ বসু, কলকাতা: একুশের নির্বাচনে ২১ হাজারের বেশি ভোটে জিতে রাসবিহারী কেন্দ্রের বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। এবারের প্রেক্ষাপট একেবারে আলাদা। লড়াই চলছে ‘জোর করে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার’ বিরুদ্ধে। রাজ্যের অন্যান্য কেন্দ্রের মতো রাসবিহারীর মানুষকেও সম্মুখীন হতে হয়েছে এসআইআর হয়রানির। বাদ গিয়েছে ৪২ হাজার ভোটারের নাম। এখনও ট্রাইবুনালে ঝুলে রয়েছে কয়েক হাজারের ভোটাধিকার। এসবের মাঝেই তৃণমূল প্রার্থীর বাড়ি-অফিসে আয়কর হানায় অনেকটাই বেড়েছে এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক পারদ। তবে এসব নিয়ে একেবারেই বিচলিত নন পুর রাজনীতির আঁতুড়ঘরে লড়াই করে উঠে আসা দেবাশিস কুমার। ‘গেরুয়া আগ্রাসনের’ চোখরাঙানি এতটুকু নাড়াতে পারেনি দক্ষিণ কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই লড়াকু সৈনিককে। তাঁর এই আত্মবিশ্বাস যে এতটুকু লোক দেখানো নয়, তা বোঝা গেল ‘দেবাদা’র জয় নিয়ে প্রত্যয়ী রাসবিহারী এলাকার একাধিক বাসিন্দাদের কথাতেই। তাঁরা মনে করছেন, এজেন্সির হানা আসলে দেবাদার জয়ের ব্যবধানকেই বাড়িয়ে দেবে। ফলে কালীঘাট স্কাইওয়াকের মতোই মসৃণ হবে তাঁর জয়ের পথ।
কিন্তু হঠাৎ করে এলাকাবাসীর মুখে কালীঘাট স্কাইওয়াকের কথা উঠে এল কেন? কারণ, শক্তিপীঠ কালীঘাট মন্দির এই কেন্দ্রের ৮৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। এখানে পুজো দিয়ে ভোট প্রচার শুরু করেছিলেন দেবাশিস কুমার। তারপর প্রতিটি বাড়িতে হেঁটে গিয়ে জনসংযোগ করেছেন তিনি। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে তৈরি আন্তর্জাতিক মানের ঝাঁ চকচকে কালীঘাট স্কাইওয়াক এখন এই কেন্দ্রের উন্নয়নের প্রধান নিদর্শন। তার সঙ্গে রয়েছে মন্দির চত্বরের আমূল সংস্কার। এছাড়াও ছ’টি বুস্টার পাম্পিং স্টেশন তৈরি, এলাকাবাসীকে স্ট্রিট ফুড হাব উপহার দেওয়া, পূর্ব ভারতের প্রথম ট্রি অ্যাম্বুলেন্স চালু করা, মর্চুয়ারি অ্যাট ডোর স্টেপের মতো উদ্যোগও বিরোধীদের থেকে অনেকটা এগিয়ে রেখেছে দেবাশিস কুমারকে।
তবে ভোট কৌশল ঠিক করার ক্ষেত্রে রাজ্যের শাসকদলকে মাথায় রাখতে হচ্ছে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের পরিসংখ্যান। ১৯৭৭ সাল ব্যতীত ১৯৭১ থেকে এই কেন্দ্র প্রথমে কংগ্রেস পরবর্তীতে তৃণমূলের দখলে থেকেছে। ফলে এই কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখা জোড়াফুল শিবিরের কাছে কার্যত প্রেস্টিজ ফাইট। সেই হিসাবে দেখতে গেলে ২০২৪ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূল মাত্র ১ হাজার ৬৯১ ভোটে লিড পেলেও ন’টির মধ্যে চারটি ওয়ার্ডে (৮১, ৮৬, ৮৭ এবং ৯৩) এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। তবে এবার তার উলটপুরাণ নিশ্চিত করে মার্জিন আরও বাড়বে বলেই আশাবাদী দেবাশিস কুমার। দীর্ঘ ২৬ বছরের পুর প্রতিনিধি ‘পাড়ার ছেলে দেবা’র কার্যত প্রতিদিনের যাতায়াত এই কেন্দ্রের আরও একটি জনপ্রিয় জায়গা লেক কালীবাড়িতে। ঈশ্বরের উপর অগাধ আস্থা তাঁর। এই মানুষটির মতে, ‘বিজেপি-কমিশন-এজেন্সি যোগসাজশে করে অত্যাচার চালাচ্ছে। আমার বাড়িতে এজেন্সি পাঠিয়েছিল। মনে রাখবেন, সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। আমি এমন কিছু করিনি যে, আমাকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে। মানুষ এবার জবাব দেবে।’
দেবাশিসবাবুর এই কথার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন চারু মার্কেট, লেক, কালীঘাট চত্বরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা। টিঙ্কু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘দেবাদা সব সময় আমাদের পাশে থাকেন। তাঁর বিপুল পরিচিতিতে দাগ লাগাতেই আয়কর বিভাগের অফিসারদের পাঠিয়েছিল বিজেপি।’
চারু মার্কেট, লেক, কালীঘাট, মনোহরপুকুর, বিক্রমগড় বাজার, গল্ফ গ্রিন এবং নিউ আলিপুরের বড়ো অংশজুড়ে গঠিত এই কেন্দ্র। একদিকে যেমন বস্তি এলাকা রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে ‘লাক্সারি লিভিং-এ’ অভ্যস্ত বহুতলের বাসিন্দারা। দু’টি দিকই সমানভাবে সামাল দিতে চাইছে ডান-বাম সব শিবির। তবে এসআইআরে নাম বাদ যাওয়ার প্রভাব যে পড়তে চলেছে, তা বোঝা গেল চারু মার্কেট সংলগ্ন আশরাফি রায়ের কথায়। পাড়ার আরও পাঁচজনের সঙ্গে নাম বাদ গিয়েছে তাঁর স্ত্রী-ছেলের নাম। বামেরা বস্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক নাগরিক পরিষেবা উন্নয়ন ইস্যুতে ভোট চাইছেন। সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের প্রার্থী মানস ঘোষ জানিয়েছেন, ‘দেবাশিসবাবু রবিনহুড ইমেজ তৈরি করতে চান। কিন্তু তাঁর সঙ্গে সোনা পাপ্পুর মতো লোকজনের নাম জড়িয়ে যাওয়ার দায়ও তো তাঁকেই নিতে হবে।’ এখান কংগ্রেসের টিকিটে লড়ছেন আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়। তবে গত নির্বাচনের পরিসংখ্যান এবং প্রচারের জাঁকজমকের নিরিখে বিচার করলে এখানে দ্বিমুখী লড়াই দুই ফুলের। বিজেপির হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো হেভিওয়েট নেতারা। তৃণমূলের বিরুদ্ধে অপশাসনের অভিযোগ তুলে প্রচার চালাচ্ছেন তাঁরা। এই লড়াইয়ে পদ্ম শিবির বাজি রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত। ২০২১ সালে তারকেশ্বরে হেরেছিলেন তিনি। এবারও কি তার পুনরাবৃত্তি হবে? এ বিষয়ে দেবাশিসবাবুর উত্তর, ‘আমি কোনোদিনই আমার প্রতিপক্ষকে দুর্বল মনে করিনি। আমার প্রথম কাজই হল মানুষের সঙ্গে থাকা। ৪ মে বোঝা যাবে, বিজেপির অত্যাচারের বিরুদ্ধে গণদেবতা কী রায় দেয়।’