• ‘মার্জিন বাড়বেই’, আত্মবিশ্বাসী সুজিত লেকটাউন মোড়ের ঘড়ি বলছে, ‘ঠিক ঠিক ঠিক’
    বর্তমান | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: সল্টলেক-লেকটাউনে ঝালমুড়ির অনেক দোকান। তবে বিধাননগর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসু প্রচারে বেরিয়ে ঝালমুড়ি খাননি। এটা বড়ো বিষয় নয়। বড়ো হল, এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শ্বারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও প্রচারে বেরিয়ে ঝালমুড়ি খাননি। তাঁর দলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা নরেন্দ্র মোদি ঝালমুড়ি খেলেও শ্বারদ্বত খাননি। এর জন্য কি দলে নম্বর কমতে পারে? শ্বারদ্বতের প্রতিক্রিয়া, ‘না না।’ 

    (২০১১ সাল। পরিবর্তনের প্রবল ঝড়। বিধাননগর বিধানসভা। তৃণমূলের সুজিত পেলেন ৮৮ হাজার ৬৪২ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএমের পলাশ দাস পেলেন, ৫২ হাজার ৭১৭। প্রায় ৪০ হাজার ভোটে জয় তৃণমূলের।)

    মোদির দৌলতে ঝালমুড়িও ২০২৬’এর ভোটের খোরাক! এসআইআরে নির্বিচারে নাম বাদ। অন্য রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের উপর বারবার আক্রমণ। ১০০ দিনের কাজ আটকানো। লাগাতার সাম্প্রদায়িক উস্কানি। কেন্দ্রীয় অনুদান আটকে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন আটকানোর বেলাগাম চেষ্টা ঢাকা পড়ছে ঝালমুড়ির মতো প্রচারে। জোড়াফুল শিবিরের দাবি, সারা বাংলা এক হয়ে লড়ছে গেরুয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। বিধাননগরের সুজিত বসুও লড়ছেন।

    (২০১৬ সাল। সিপিএম-কংগ্রেসের জোট। বিধাননগরে তৃণমূলের সুজিত পেয়েছিলেন ৬৬ হাজার ১৩০ ভোট। জোটপ্রার্থী অরুণাভ ঘোষের প্রাপ্ত ভোট ৫৯ হাজার ১৪২। সুজিতের ভোট কমলেও জিতলেন প্রায় ৭ হাজার ভোটে।)

    সুজিতের সুবিধাটা হল, তিনি একটু বেশি লম্বা। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি হাইট। ফলে অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখতে পান। সে কারণে লেকটাউন এবং অভিজাত সল্টলেক ছাড়িয়ে বিধায়কের চোখ পৌঁছায় বাইপাস থেকে সাড়ে আট কিলোমিটার ভিতরে, আদিবাসী অঞ্চল গোরুমারা পর্যন্ত। ২০১১ সালের পর গোরুমারা বাঁধানো রাস্তা, পরিস্রুত পানীয় জল পেয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ঢুকছে ঘরে। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী পাচ্ছে সবাই। গোরুমারার সুমিত মুন্ডা বলেন, ‘২০১১ সালের পর এখানে রাস্তা হয়েছে।’ তার অদূরে ছয়নাভি বি এইট, ভেড়ি অঞ্চল। স্থানীয় বাসিন্দা শম্পা সর্দার বললেন,‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়মিত পাচ্ছি।’ মৎসজীবী প্রধান এই এলাকার বিস্তীর্ণ অংশের মানুষ আতঙ্কিত। বলছেন, ‘বিজেপি এলে মাছ বন্ধ করে দেবে। তখন আমরা রুটিরুজি হারাব। খাব কী?’ ভেড়ির পাশ দিয়ে পথ। সেখান থেকে মেরেকেটে পাঁচ কিলোমিটার হবে হাইটেক শহর সল্টলেক সেক্টর ফাইভ, রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পতালুক। তার গা ছোঁয়া অঞ্চল হল সল্টলেক। অভিজাত উপনগরী। বাঙালি, অবাঙালি, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের বসবাস। সল্টলেকের একাংশ চিরকালই একটু শাসকের উলটো দিকে ঝুঁকে থাকে। সিপিএমের সময় পুরসভার ২৩টি ওয়ার্ডে বিরোধী কাউন্সিলার ছিলেন ১১ জন। এই বিরুদ্ধতা লোকসভা ভোটে বেশি টের পাওয়া যায়। আর বিধানসভা ভোটে? সল্টলেকের ভোটে অবাঙালি মানুষদের ভালো প্রভাব আছে। উপনগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ‘মারোয়ারি সংসদ’এর ললিত প্রহ্লাদকর বলেন, ‘আমরা দল নয়। সুজিত বসুকে দেখে ভোট দিয়ে থাকি।’

    (২০১৪ সাল। লোকসভা ভোট। বিজেপির ঝড়। বারাসত লোকসভা আসনে জিতলেন তৃণমূলের কাকলি ঘোষ দস্তিদার। দ্বিতীয় ফরওয়ার্ড ব্লকের মোর্তাজা হোসেন। বিজেপি তৃতীয় স্থানে। বিধাননগরে পিছিয়ে তৃণমূল)

    বিধানননগর পুরনিগমের ১৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ দমদমের ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে বিধাননগর বিধানসভা। এর মধ্যে ওয়ার্ড নম্বর ২৮ (নয়াপট্টি, মহিষবাথান), ৩৫ (সুকান্তনগর), ৩৬ (ছয়নাভি, কুলিপাড়া, গোরুমারা), ৩৮, ৩৯ (দত্তাবাদ) হচ্ছে সংযোজিত এলাকা। দত্তাবাদের বাসিন্দা নমিতা দাস বলেন, ‘সরকার আমাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে। মাসে মাসে টাকাও পাই।’ সুকান্তনগরের পলাশ বর বলেন, ‘আগে বাস ছিল না তেমন। এখন রাস্তাও ভালো। গাড়ি পেতেও সমস্যা হয় না।’

    (২০১৯ লোকসভা। বারাসতে তৃণমূলের কাকলি ঘোষ দস্তিদার জেতেন। বিজেপির মৃণালকান্তি দেবনাথ দ্বিতীয় স্থানে। কিন্তু বিধাননগরে ১৮ হাজার ৯১৬ ভোটে পিছিয়ে তৃণমূল)

    এখানে লক্ষ্যণীয়, সংযোজিত এলাকা দত্তাবাদ, সুকান্তনগর, নয়াপট্টি এবং দক্ষিণ দমদম ভোটে এগিয়ে রাখে তৃণমূলকে। অভিজাত অঞ্চল অর্থাৎ মূল সল্টলেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকে জোড়াফুল শিবির। 

    (২০২১ সাল। বিধানসভা ভোট। দল পরিবর্তন করে বিজেপির হয়ে বিধাননগরে দাঁড়ালেন তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা সব্যসাচী দত্ত। সুজিত পেলেন ৭৫ হাজার ৯১২ ভোট। সব্যসাচীর ঝুলিতে ৬৭ হাজার ৯১৫। তৃণমূল জিতল প্রায় ৮ হাজার ভোটে।) 

    তৃণমূলের প্রার্থী সুজিত বসু এবারের নির্বাচন নিয়ে বলছেন, ‘মার্জিন বাড়বে। মানুষ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দেবেন। সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে পরাস্ত করবেন। বিধাননগরের উন্নয়ন মানুষ চোখ খুললেই দেখতে পান। তাঁরা আমাকে আরও বেশি ভোটে জিতিয়ে আনবেন।’ সিপিএমের সৌম্যজিৎ রাহা বলছেন,‘অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। ১৮ থেকে ৮৫ বছর বয়সি মানুষ আমার হয়ে মাঠে নেমেছেন। জিতব।’ বিজেপির ডাঃ শ্বারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘পাল্টানো দরকার। কারণ জিরো উন্নয়ন। আমার জিত নিশ্চিত। তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত। তাদের বিরুদ্ধেই ভোট দেবে মানুষ। এসআইআর নিয়ে মমতা মিথ্যা বলছেন। এসআইআর অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।’ 

    (২০২৪ লোকসভা। পুনরায় জিতলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। হারালেন বিজেপির স্বপন মজুমদারকে। কিন্তু বিধাননগরে তৃণমূল পিছিয়ে ১১ হাজার ১৫৬ ভোটে।)

    এবার ভোটে অন্যতম বড়ো ফ্যাক্টর এসআইআর। বিধাননগর বিধানসভা এলাকায় জানুয়ারি ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৪৮ হাজার ৬২। এসআইআরে কমবেশি ৪৬ হাজার নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই বিপুল সংখ্যা সবথেকে বেশি প্রভাবিত করবে কোন দলকে? তৃণমূল না বিজেপি? এই ভোটে সে দিকেই চোখ সবার। সঙ্গে দেখার, আত্মীয়-পরিজন-বন্ধু-প্রতিবেশীদের নাম বাদ যাওয়ার ক্ষোভ বিধাননগরের ভোটযন্ত্রে কতটা ঝড় তোলে।  
  • Link to this news (বর্তমান)