• EC-র নজরবন্দিতে না-থাকা কেষ্টও কৌশল পাল্টে মেঘনাদ
    এই সময় | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • হেমাভ সেনগুপ্ত, বোলপুর

    এই কেষ্ট কি সেই কেষ্ট! তাঁর উপরে নজরদারিই বা কোথায় আগের মতো! বঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রথম দফার ভোটের পরে সব চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ভোটের হার নিয়ে। তবে বীরভূম জেলায় তৃণমূলের শীর্ষনেতা অনুব্রত ওরফে কেষ্ট মণ্ডলের 'কুল অবতার' ও তাঁর ভোট–স্ট্র্যাটেজি নিয়েও চর্চা কিছু কম নয়।

    আবার কেষ্টকে িনয়ে নির্বাচন কমিশনের স্ট্র্যাটেজিতেও অবাক অনেকে। কারণ, ২০১৯-এর লোকসভা ভোট ও ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের দিন অনুব্রত মণ্ডলকে দিনভর কার্যত গৃহবন্দি বা নজরবন্দি করে রেখেছিল কমিশন। এ বার সে রকম কিছু হয়নি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের মনোভাব যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে ভারতীয় ফুটবলে 'ডায়মন্ড সিস্টেম'–এর আনুষ্ঠানিক প্রণেতা, প্রয়াত কোচ অমল দত্তকে। ওই সিস্টেম চালু করার পরে যিনি আর পুলিশম্যান মার্কিংয়ে তেমন বিশ্বাস করতেন না।

    তাঁর বিশ্বাস ছিল, দলের রক্ষণভাগ এতটাই মজবুত হবে যে, তাতে আটকে যাবে প্রতিপক্ষের যে কোনও খেলোয়াড়। নির্বাচন কমিশনও যেন মনে করেছিল, অনুব্রত মণ্ডলকে নজরবন্দি করার প্রয়োজন নেই, কারণ এ বারের ভোটে সর্বত্র যে রকম নিরাপত্তা ও নজরদারির বন্দোবস্ত, তাতে তিনি 'জারিজুরি' করতে পারবেন না।

    তবে কেষ্টর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ইলেকশন কমিশন যেমন কৌশল বদল করেছে, তেমনই স্ট্র্যাটেজি পাল্টেছেন তাঁদের দাদাও— মেঘনাদের মতো আড়াল থেকে ভোট পরিচালনা করেছেন তিনি এবং সবটাই 'রিমোট কন্ট্রোল'–এ।

    এমনিতে অনুব্রত এখন বীরভূমের জেলা তৃণমূল সভাপতি নন। জেলায় দলের সংগঠনের দায়িত্বে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়ে দেওয়া ৯ সদস্যের কোর কমিটি, কেষ্ট যার অন্যতম সদস্য। আগে ভোটের দিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনেই মোবাইল তুলে দলীয় কর্মীদের কেষ্ট জিজ্ঞেস করতেন, 'কত ভোট হলো? ওটা এ বার একটু বাড়াতে হবে।' আবার কখনও তাঁর নির্দেশ যেত, 'হাত চালিয়ে।' কেষ্টর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রের খবর, এ বারও নাকি কর্মীদের কাছে 'দাদা'–র থেকে হাত চালিয়ে খেলার নির্দেশ গিয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যম তার সাক্ষী ছিল না।

    বৃহস্পতিবার সকাল সকাল বোলপুরের নিচুপট্টির বাড়ির কাছে ভগবতী নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে ভোট দেন অনুব্রত, কন্যা সুকন্যা মণ্ডল ছিলেন বাবার সঙ্গে। ফুরফুরে মেজাজে থাকা কেষ্ট বলেন, 'খুব ভালো ভোট হচ্ছে। গরম পড়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল, সব ভোট তৃণমূল।' ভোট দিয়ে কেষ্ট চলে যান বোলপুরের পার্টি অফিসে। সেখানে দলের নেতা–কর্মী, আইনজীবীদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ভোটের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের খবর নেন।

    তখন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তাঁর ঘরেই। তবে দুপুর গড়াতেই সাংবাদিকদের আর নিজের ঘরে বসার অনুমতি দেননি কেষ্ট। সূত্রের খবর, তার পরে শুরু হয় প্রতিটি ব্লকের সভাপতিদের ফোন করে কেষ্টর খুঁটিয়ে খবর নেওয়া। কেষ্টর পাশে তখন বসা সুদীপ্ত ঘোষ, প্রলয় নায়েকের মতো নেতারা। ব্লক সভাপতিদের যখন তাঁকে ফোনে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন একটা সময়ে অনুব্রত মণ্ডলকে বলতে শোনা যায়, 'বাইরে খুব রোদ। মাথাটা ঠান্ডা রাখো। এখনও সময় আছে, তাড়াহুড়ো নয়। আস্তে ভোট করাও।'

    তৃণমূল সূত্রের খবর, ব্লক সভাপতিদের সবাইকে ফোন করা শেষ হলে কাচের কাপে লিকার চায়ে চুমুক দেন কেষ্ট। তার পরে শুরু হয় অঞ্চল (গ্রাম পঞ্চায়েত) সভাপতিদের ফোনে ধরা। ততক্ষণে বেলা গড়িয়েছে। স্বভাবোচিত মেজাজে কেষ্টর সেই পুরোনো নিদান, 'এ বার হাত চালিয়ে খেলো।' সব প্রার্থীকে ফোন করে খোঁজখবর নেন কেষ্ট মণ্ডল।

    অনুব্রত-ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতার কথায়, 'দাদা এ বারও জেলা জুড়ে ভোটটা করাল, তবে আড়াল থেকে।'

  • Link to this news (এই সময়)