‘ঘায়েল হুঁ ইস লিয়ে ঘাতক হুঁ’— ধুরন্ধরের হামজা আলি মাজারির এই ডায়লগের আসল অর্থ বাস্তবে বুঝিয়ে দিলেন রাঘব চাড্ডা। রাজ্যসভায় ডেপুটি লিডারের পদ থেকে তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেননি রাঘব। অচিরেই যে আপ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘুচতে চলেছে সে ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর এক গুগলিতে যে রাজ্যসভায় কেজরির ঘরেই ভাঙন ধরবে তা কেউ ভাবেনি।
শুক্রবারই সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যসভার সাংসদ রাঘব চাড্ডা জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন কোনও দল নয়, তিনি আপ ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু চমক এখানেই শেষ নয়, তাঁর পথের সঙ্গী রাজ্যসভায় তাঁর আরও ছয় সহকর্মী। রাঘব-সহ আপের সাত রাজ্যসভার সাংসদ এদিন যোগ দেন বিজেপিতে। এই ধাক্কাকে আপ শিবির পাঞ্জাব ভোটের আগে বিজেপির ‘অপারেশন লোটাস’ বলে ব্যাখ্যা করেছে। পার্টি সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কথায়, ‘এটা আসলে বিশ্বাসঘাতকতা’।
এদিন রাজ্যসভার ১০ আপ সাংসদের মধ্যে রাঘব-সহ সাত জন সরকারি ভাবে বিজেপি শিবিরে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন। এই ঘটনা সামনে আসতেই তড়িঘড়ি সাংবাদিক সম্মেলন করে পদ্মশিবিরকে তুলোধোনা করেন আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং। সরব হন অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। সরাসরি বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি এক্স পোস্টে লেখেন, ‘বিজেপি আবারও পাঞ্জাবের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’ তাঁর দাবি, জনগণের নির্বাচিত মতামতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিকভাবে দল ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও আপ সুপ্রিমো রাঘব চাড্ডা বা অন্য কোনও সাংসদকে নিয়ে মন্তব্য করেননি।
রাঘবের সঙ্গে আর ছয় সাংসদ দল ছাড়ায় সাংবাদিক সম্মেলনে ক্ষোভ উগড়ে দেন আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং। সাংবাদিক বৈঠক করে তীব্র আক্রমণ শানান সাংসদ। তিনি বলেন, রাঘব চাড্ডার এই পদক্ষেপ শুধু দলবিরোধী নয়, পাঞ্জাবের মানুষের সঙ্গেও সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’। তাঁর কথায়, ‘পাঞ্জাবের মানুষ এই সাত জন সাংসদকে কখনও ক্ষমা করবে না।’
বিজেপির উদ্দেশে জোরালো আক্রমণ শানিয়ে সঞ্জয়ের অভিযোগ, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে অপারেশন লোটাস চালানো হচ্ছে। যার লক্ষ্য বিরোধী দল ভাঙা এবং পাঞ্জাবের ভগবন্ত মান সরকারের কাজ ব্যাহত করা।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, রাঘব চাড্ডা সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, আম আদমি পার্টি আগের মতো নেই এবং দলের আদর্শ থেকে সরে গেছে। তাঁর কথায়, ‘যে আপ-কে আমি আমার জীবনের ১৫ বছর দিয়েছি, এখন দলটি সৎ রাজনীতি থেকে সরে গিয়েছে। আমি ভুল দলে সঠিক ব্যক্তি। তাই আমি দূরে সরে যাচ্ছি । আজকের আপ দুর্নীতিগ্রস্ত ও আপসকারী।’ তিনি জানান, রাজ্যসভায় AAP-এর মোট সাংসদের দুই-তৃতীয়াংশ তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন এবং সংবিধানের নিয়ম মেনে তাঁরা বিজেপিতে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে সন্দীপ পাঠক, অশোক মিত্তল, স্বাথী মালেওয়াল, হরভজন সিং-সহ আরও কয়েকজন সাংসদ এই সিদ্ধান্তে সামিল হয়েছেন।
এই ঘটনায় AAP-এর রাজ্যসভায় শক্তি এক তৃতীয়াংশ হয়ে গিয়েছে। রাঘবের কন্ঠরোধের পাল্টা এখন রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টিরই অস্তিত্ব সঙ্কটে। এমনকী রাঘবের বদলে যে আপ সাংসদ অশোক মিত্তলকে ডেপুটি লিডার করেছিল আপ, তিনিও একই পথের পথিক। রাজ্যসভায় মোট ১০ জন আপ সাংসদের মধ্যে প্রায় সাত জনের দলত্যাগ একটি বড় রাজনৈতিক সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে এবং আসন্ন পাঞ্জাব নির্বাচনে এর প্রভাব দেখা যেতে পারে।
পুরো বিষয়টি ঘিরে দিল্লি ও পাঞ্জাব—দুই জায়গাতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে AAP এটিকে ‘পরিকল্পিত ভাঙন’ বলছে, অন্যদিকে বিজেপি এই ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখছে।