মণিপুর (Manipur) থেকে ইজ়রায়েল (Israel)—এ এক দীর্ঘ যাত্রা। তার শেষে রয়েছে পিতৃপুরুষের ভিটে-মাটিতে ফিরে যাওয়ার গল্প। উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি রাজ্যগুলি থেকে ‘বনে মেনাশে’ গোষ্ঠীর ৫ হাজার ইহুদিকে এয়ার লিফট করে ইজ়রায়েলে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকার (Benjamin Netanyahu Government)। বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) প্রথম দফায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে ২৫০ জনকে। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে বিশেষ বিমানে তাঁদের নিরাপদে তেল আভিভে নিয়ে গিয়েছে ইজ়রায়েলি সেনা।
‘বনে মেনাশে’ গোষ্ঠীর সদস্যরা থাকেন মণিপুর এবং মিজ়োরামের পাহাড়ি এলাকায়। বর্তমানে তাঁরা ‘কুকি‘ বলেই পরিচিত। কিন্তু এই জনগোষ্ঠী ইতিহাসের অংশ। ‘বনে মেনাশে’-ই ইহুদিদের ১০টি ‘লস্ট ট্রাইব’-এর একটি। ইজ়রায়েলের একটি ঘোষিত নীতি রয়েছে: ইহুদিরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, তাঁরা যে কোনও সময়ে সেই দেশে ফিরতে পারেন। ‘বনে মেনাশে’কে সে ভাবেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইজ়রায়েলে। এর পিছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার ২৫০ জনকে যে ভাবে তেল আভিভে নিয়ে গিয়েছে ইজ়রায়েলি সেনা, তার পিছনে মণিপুরের গোষ্ঠী সংঘর্ষের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশেষ এই সেনা অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন উইংস অফ ডন’। ইজ়রায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী ওফির সোফার সংবাদমাধ্য়মকে জানিয়েছেন, ‘প্রতি বছর বনে মেনাশে গোষ্ঠীর ১২০০ ইহুদিকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’ এর জন্য গত বছর (২০২৫) বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার।
বাইবেলে বলা হয়েছে, ১২টি গোত্রের মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল প্রাচীন ইজ়রায়েল। এর মধ্যে যোসেফের পুত্রদ্বয় এফ্রাইম আর মনশে-র থেকে জন্ম নিয়েছিল দু’টি গোত্র। ‘বেনাই মেনাশে’-রা নিজেদের সেই মনশের বংশধর বলে দাবি করেন। ৭২২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে অ্যাসিরিয়রা হামলা চালায় ইজ়রায়েলে। ছন্নছাড়া হয়ে যায় ইজ়রায়েলের ১০টি গোষ্ঠী। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেনাশে-কে প্রাণ হাতে করে পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত ও চিন পেরিয়ে চলে আসতে হয় ভারতে। তার পরে ধীরে ধীরে মণিপুর ও মিজ়োরামে বসতি গড়ে তোলেন তাঁরা।
মণিপুরে অধিকাংশ কুকি-ই এখন খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু মেনাশে-রা এখনও ধরে রেখেছেন নিজেদের ধর্ম পরিচয়। নিজেদের ইহুদি সত্ত্বা। মেনাশেদের দেখতে ঠিক ইহুদিদের মতো নয়। মুখের গঠনে একটা মঙ্গোলিয়ান ছাপ আছে। এক লহমায় অরুণাচল বা মণিপুরের মানুষদের থেকে তফাত করা যায় না।
মেনাশে-রা মূলত কৃষক। মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় তাঁদের জমিজমাও রয়েছে। কৃষিকাজ করেন। কিন্তু আয় খুব কম। তাই ইজ়রায়েলে ফিরে যেতে চান তাঁরাও। হামাসের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে ইজ়রায়েলেও শ্রমিক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে তারাও আগ্রহী। গত কয়েক দশকে প্রায় ৫ হাজার মেনাশে ইজ়রায়েলে ফিরে গিয়েছেন। সেখানে অধিকাংশই ট্রাক চালান। কিংবা শ্রমিকের কাজ করেন। বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ডলার আয় হয়। সেখানে ভারতে তাঁদের আয় হতো ১,২০০ ডলার মতো। ইহুদি ফিরে যাওয়ার আগে এক মেনাশে বলেন, ‘ভারত জন্মভূমি। কিন্তু ইজ়রায়েলের সঙ্গে আমাদের নাড়ির টান। ফিরতে হবেই।’ কারণ যাই হোক, বাবা-ঠাকুরদার জমিতে ফিরে যাওয়ার যাত্রাই এ বার শুরু হলো।