রায়গঞ্জে বৃদ্ধাকে ডাইনি অপবাদে বিবস্ত্র করে মল-মূত্র খাওয়ানোর অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ
আজ তক | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Raiganj Witch Hunting News: উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ থানার বড়ুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রায়পুর সংলগ্ন কানাইপুর এলাকায় এক বৃদ্ধাকে ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে পৈশাচিক অত্যাচার চালাল একদল প্রতিবেশী। নিগৃহীতা বৃদ্ধা বর্তমানে রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
ঘটনার সূত্রপাত মাসখানেক আগে। গ্রামের বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ছিল, সম্প্রতি এক যুবকেরও অকাল মৃত্যু হয়। আধুনিক চিকিৎসার পথে না হেঁটে গ্রামের মাতব্বরেরা ধরে নেন, এর পিছনে কোনও ‘অশুভ শক্তি’ রয়েছে। গত ২০ তারিখ গ্রামে সালিশি সভা বসিয়ে হেমতাবাদ থেকে আনা হয় এক ওঝাকে। সেই ওঝাই নিদান দেয়, গ্রামের এক বিধবা মহিলাই আসলে ‘ডাইনি’।
ওঝার নিদান ছিল আরও ভয়াবহ। বলা হয়, ওই বৃদ্ধাকে তিন দিন ধরে মলমূত্র খাওয়াতে হবে, আর তাতে কাজ না হলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলতে হবে। এই অন্ধকার নিদান শুনে রুখে দাঁড়ানো তো দূর, উল্টে পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠে গ্রামের একাংশ। বৃহস্পতিবার রাতে আনন্দী বর্মন (৬৪) নামে ওই বৃদ্ধার ওপর চড়াও হয় প্রতিবেশীরা।
অভিযোগ, বৃদ্ধাকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রতিবেশী লক্ষ্মী বর্মনের বাড়িতে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে বিবস্ত্র করে, হাত-পা বেঁধে পিলারের সঙ্গে ঝুলিয়ে দফায় দফায় চলে অমানবিক মারধর। পাশবিকতার সীমা ছাড়িয়ে তাঁকে জোর করে মলমূত্র খাওয়ানো হয় বলে অভিযোগ। শনিবার তাঁকে পিটিয়ে মারার চূড়ান্ত ছকও কষে ফেলেছিল উন্মত্ত জনতা।
শুক্রবার সকালে খবর পেয়েই গ্রামে ছুটে যান বৃদ্ধার মেয়ে অঞ্জু বর্মন। তিনি দেখেন, মা অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। স্থানীয়দের বাধা উপেক্ষা করে পুলিশি সহায়তায় মাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন তিনি। অশ্রুসজল চোখে তিনি জানান, দশ বছর আগে একইভাবে তাঁর বাবাকেও পিটিয়ে মেরেছিল এই প্রতিবেশীরাই। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বৃদ্ধা জানিয়েছেন, তাঁর স্বামীকেও ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে খুন করা হয়েছিল। অথচ এতদিন পরেও প্রশাসনের নজরদারি বা সচেতনতার অভাবে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। এই ঘটনায় লক্ষ্মী বর্মন, পান্তো বর্মন সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রায়গঞ্জ থানায় নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
উত্তর দিনাজপুরের পুলিশ সুপার ডঃ সোনাওয়ানে কুলদীপ সুরেশ জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং দোষীদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার পরেও গ্রামের একাংশ নিজেদের অপরাধ কবুল করা তো দূর, উল্টে একে ‘গ্রামের শুদ্ধিকরণ’ বলে সাফাই দিচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, শিক্ষার প্রসারের চেয়েও কুসংস্কার দূর করাটা এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপই পারে এই অন্ধকার সমাজকে সভ্যতার আলোয় ফিরিয়ে আনতে।