একদা বামদুর্গ যাদবপুরে এগিয়ে তৃণমূলই! বিকাশের লড়াই কি দ্বিতীয় হওয়ার?
প্রতিদিন | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
যাদবপুর। বঙ্গ রাজনীতির সাবেক লালদুর্গ। ঐতিহাসিকভাবে যাদবপুর বুদ্ধিজীবী এবং শিল্প আন্দোলনের পীঠস্থান। একই সঙ্গে বাম ও অতিবামদের আঁতুড়ঘর। ১৯৬৭ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা দক্ষিণ কলকাতার এই কেন্দ্রটি লালপার্টির দখলেই ছিল। ২০১১ সালে রাজ্যের পালাবদলের সময় একবার এবং ২০২১ সালে প্রবল দ্বিমেরু রাজনীতির আবহে যাদবপুরে জোড়াফুল ফুটেছিল। ওই দু’বার বাদ দিলে যাদবপুরের লালদুর্গে চিড় পর্যন্ত ধরাতে পারেনি অন্য কোনও দল।
এই যাদবপুর শুধু যে বামেদের শক্ত ঘাঁটি তা-ই নয়, ওই বিধানসভা কেন্দ্রটি নিয়ে বামপন্থীদের মধ্যে অন্য আবেগের জায়গাও রয়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই যাদবপুর থেকেই পাঁচবারের বিধায়ক হয়েছেন। জীবনের শেষ নির্বাচনে বুদ্ধবাবুকে হারতেও হয়েছিল এই যাদবপুর থেকেই। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই যাদবপুরে একটা সময় বামদের সংগঠন খুব শক্তিশালী ছিল। সেই দুর্ভেদ্য সংগঠন, ভোট মেশিনারি একদিনে তৈরি হয়নি। তিল তিল করে সিপিএম তা গড়ে তুলেছিল ১৯৭৭-এ ক্ষমতায় আসার পর। ১৯৪৭-এর দেশবিভাজনের পর ওপার বাংলা থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে কাতারে কাতারে আসা ছিন্নমূল উদ্বাস্তু কলোনিগুলিতে বাম ভাবনার একটা প্রেক্ষাপট ছিলই, ১৯৭৭-এ পালাবদলের সুবাদে সেখানে বামেরা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সংগঠন জোরদার করে তোলে। বিজয়গড়, বিক্রমগড়ের মতো এলাকার উদ্বাস্তু পরিবারগুলির শিশু-কিশোররা যুবক বয়সে পার্টির হয়ে রাস্তায় নামতেন। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় তার চেহারা ছিল সর্বাত্মক, ফাঁকফোকরহীন। একচ্ছত্র, প্রশ্নাতীত আধিপত্য কায়েম করেছিল বামেরা। কলোনি কমিটি, স্কুল, কলেজ পরিচালন সমিতি, বাজার, ক্লাব কমিটি সবই ছিল তাদের দখলে। এলাকার সব ব্যাপারেই তাদের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পার্টির একপেশে দাপট দিনদিন সীমা ছাড়াতে শুরু করল একটা সময়। পারিবারিক ঝামেলা, স্বামী-স্ত্রীর বিবাদেও ঢুকে পড়ত পার্টির লোক, মহিলা সমিতির সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রেই ন্যয্য বিচার হত না। দলীয় মুখপত্র অনেক বাড়িতে বাধ্য হয়ে রাখতে হত। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠতে শুরু করে বাম আমলের শেষদিকে। এসবের ফলে রাজ্যে পালাবদলের পর যাদবপুরে বামপ্রভাব আলগা হয়েছে। সেই আসন পুনরুদ্ধারে এবারে বামেরা প্রার্থী করেছে প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ তথা নামী আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। আর তৃণমূলের প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক দেবব্রত মজুমদার। বিজেপি প্রার্থী করেছে টেলি অভিনেত্রী শর্বরী মুখোপাধ্যায়কে।
যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র পুরোপুরি শহুরে। গড়িয়া, টালিগঞ্জ ও ঢাকুরিয়ার মতো জনবহুল এলাকা ঘেরা এই বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৯১ জন। এসআইআরে সব মিলিয়ে বাদ পড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। এই আসনে তফসিলি জাতি ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারদের প্রায় ১১.৬৮ শতাংশ, আর মুসলিম ভোটারদের সংখ্যা আনুমানিক ৮ শতাংশ। যাদবপুর সম্পূর্ণ শহুরে এলাকা, এখানে কোনও গ্রামীণ ভোটার নেই। তবুও ভোটদানের হার ধারাবাহিকভাবে ৮০ শতাংশের ওপরে থেকেছে, যা রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকে এই এলাকার সক্রিয় ভূমিকারই প্রমাণ। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজ ভারতের অন্যতম সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখেছে। এই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ই রাজ্যের বাম ও অতিবাম রাজনীতির আঁতুড়ঘর।
কলকাতা পুরসভার ৯৬ থেকে ১১০ নম্বর ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে গঠিত যাদবপুর বিধানসভার মূল সমস্যা পানীয় জল ও নিকাশি ব্যবস্থা। এছাড়া রাস্তাঘাটের সমস্যা, কলোনি এলাকাগুলির সার্বিক উন্নয়ন এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। একটা সময় এই এলাকায় বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানা ছিল যা বাম আমলে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেকটা সংকুচিত। কলকাতার আর পাঁচটা এলাকার মতো যাদবপুরের বহু পরিবারের যুবক-যুবতীরা ভিনরাজ্যে।
এলাকায় বামেদের মূল শক্তি সেই পুরনো ভোটব্যাঙ্ক এবং আবেগ। দূর দূর থেকে যাদবপুরে পড়তে আসা পড়ুয়ারা পার্টির হয়ে ঝান্ডা ধরা এবং দেওয়াল লিখনের কাজ করে। ফলে কর্মীরও খুব অভাব নেই। সমস্যা হল প্রার্থী নির্বাচন। পুরনো ভোটারদের মধ্যে পেনিট্রেট করার জন্য বিকাশকে প্রার্থী করে হয়তো আবেগের জায়গাটা ধরতে চেয়েছিল সিপিএম। ফার্স্ট রাউন্ডে প্রচারে বেরিয়েই একাধিক জায়গায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিকাশ। আড়ালে লোকে তাঁকে ডাকছেন, ‘চাকরিখেকো’ নামে। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যর করা মামলার প্রেক্ষিতেই ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল বাংলার ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাই কোর্ট। সে প্যানেলের সবাই অযোগ্য ছিলেন না। যার জেরে ভোট প্রচারে ‘কটূক্তি’ শুনতে হচ্ছে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। পিঠ বাঁচাতে যাঁর ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা, তিনি মারা গিয়েছেন দু’বছর হতে চলল। শুভ্র কেশ, কালো ফ্রেমের ফোটোক্রোম্যাটিক লেন্সের চশমা, পাতলা ঠোটের চেনা হাসির মালিককে চেনে যাদবপুর। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। যাদবপুর বিধানসভার সিপিএম কর্মীরা বলছেন, “এই ইউএসপিটাই শেষ ভরসা। অস্বীকার করে তো লাভ নেই বুদ্ধবাবুর একটা ইমেজ আছে। কর্মসংস্থানের জন্য তিনি লড়েছিলেন। যাদবপুরের মানুষকে আমরা সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছি।” তাছাড়া রাজ্যে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া কাজ করছে বলেও বামেদের দাবি।
আর তৃণমূলের মূল ভরসা সংগঠন এবং পরিষেবা। তৃণমূলের দাবি, ইতিমধ্যেই পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে যাদবপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বুস্টার পাম্পিং স্টেশন তৈরি হয়েছে। ঢালাই ব্রিজে নতুন জলপ্রকল্প তৈরি হচ্ছে। টালা, পলতা, গার্ডেনরিচ, ধাপার পর যাদবপুর এই প্রথম কোনও জলপ্রকল্প পাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি চালু হয়ে যাওয়ার কথা। তারপরে যাদবপুর বিধানসভার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের আর ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর করতে হবে না। তাছাড়া এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ নিয়েছেন। তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদারের দাবি, আগামী দিনে বাঘাযতীন স্টেশন রোডে যানজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেখানে হকার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হবে। তিনি জানাচ্ছেন, “আমরা কাউকে সরাব না। হকারদের জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখতে আমরা সুসংগঠিত ভেন্ডার ব্যবস্থাপনা চালু করব।” যাদবপুর অঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল বাঘাযতীন এবং বিজয়গড়। তৃণমূলের দাবি, হাসপাতালগুলিতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে, যেমন ডিজিটাল এক্স রে সহ নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। তবে, আগামী দিনে বাঘাযতীন হাসপাতাল এবং বিজয়গড় হাসপাতালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য সেখানকার পরিকাঠামো আধুনিকীকরণের কাজ করা হবে। কয়েকটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায় বর্ষার শুরুতেই। সেই সমস্যা মেটানোর আশ্বাসও দিচ্ছে শাসকদল। দেবব্রত মজুমদারের সুবিধা হল, তিনি এলাকায় থাকেন। তাঁর কাছে গেলে কাউকে খালি হাতে ফিরতে হয় না। ফলে নিজস্ব ভাবমূর্তি তাঁর স্বচ্ছ্ব এবং ‘কাছের লোকে’র। তাছাড়া সংগঠনও চরম শক্তিশালী তৃণমূলের। যে কলোনি এলাকাগুলিতে একসময় লালঝান্ডা উড়ত সেগুলির বেশিরভাগই এখন তেরঙ্গা ঘাসফুল দেখা যায়। শ্রীকলোনি বাজার থেকে বাঘা যতীন মোড় যাওয়ার পথে সিপিএমের পুরনো পার্টি অফিসটি কোনওক্রমে টিমটিম করে ‘জীবিত’।
লড়াইয়ে তৃতীয় পক্ষ বিজেপি। রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তের মতো যাদবপুরেও গত কয়েক বছরে বাম ভোট রামে গিয়েছে। বিজেপির সংগঠনের পালেও হাওয়া লেগেছে। ২০১৯ থেকে সব নির্বাচনেই বিজেপি এলাকায় দ্বিতীয় হয়ে আসছে। ফলে এবারে তাঁরাও পুরোদস্তুর লড়াইয়ে। প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া যদি থেকেই থাকে, তাহলে সেটার সুবিধা পাওয়ার কথা বিজেপিরও। সমস্যা হল, ভোটাররা বিভ্রান্ত। তৃণমূলের মূল প্রতিপক্ষ এখানে বিকাশ না শর্বরী, সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না কেউ। তৃণমূল অবশ্য বলছে, ওদের লড়াই দ্বিতীয় হওয়ার জন্য।