• দুই ফুলের টক্করে বামেদেরও নয়া স্লোগান 'মা-মাটি-মানুষ'!
    এই সময় | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • গৌতম ধোনি, কালীগঞ্জ

    'মা-মাটি-মানুষ' শুনলে প্রথমেই তৃণমূলের কথা মনে পড়ে, তাই তো? কিন্তু যদি বামপন্থীরা স্লোগান দেন, 'মা-মাটি-মানুষ'-এর স্বার্থেই আমাদের ভোট দিয়ে জয়ী করুন!' তা হলে?

    অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, এটা কী করে হয়! কিন্তু বাস্তবে সেটাই হচ্ছে নদিয়ার কালীগঞ্জে। স্থানীয় বামপন্থীদের মুখে এই স্লোগানই এখন 'টক অফ দ্য টাউন'। সেখানকার সিপিএম নেতারা এর ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন। সিপিএমের নদিয়া জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেবাশিস আচার্য বলছেন, 'নিহত তমন্না খাতুনের 'মা'-এর চোখের জল আজও শুকোয়নি। তমন্নার কবরের 'মাটি' নিয়ে আমরা পণ করেছি, এর বিচার চাই। আর ওই খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ আজও ক্ষোভে ফুঁসছেন। সেই কারণেই আমরা প্রচারে 'মা-মাটি-মানুষ'-এর দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরছি।'

    ২০২৫–এর ২৩ জুন, কালীগঞ্জের উপ–নির্বাচনে ভোটগণনা শেষ হওয়ার আগে একটি বিজয় মিছিল বের করেছিল রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। অভিযোগ, সেই মিছিল থেকে ছোড়া বোমার আঘাতে বাড়ির উঠোনেই মারা যায় মোলান্দি গ্রামের বছর নয়ের তমন্না। চতুর্থ শ্রেণির ওই ছাত্রীর নিহত হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। সেই তমন্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন শেখ–কে এ বার প্রার্থী করেছে সিপিএম। মেয়ের খুনের ঘটনায় সাবিনা যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন, তাঁদের কেউ শাসকদলের স্থানীয় দাপুটে নেতা, কেউ আবার সেই দলের কর্মী–সমর্থক বলে অভিযোগ। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জন ধরা পড়লেও বাকিরা এখনও অধরাই।

    দেবাশিস বলেন, 'হুড খোলা গাড়ি, বাদ্যি নিয়ে বর্ণাঢ্য প্রচার বা মিছিল করছেন না আমাদের প্রার্থী। তিনি মানুষের দরজায় দরজায় যাচ্ছেন। ভালো সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।' সাবিনার কথায়, 'নিহত ও নির্যাতিত মানুষের বিচার চেয়ে প্রচার করছি। এই শাসকদল আবারও ক্ষমতায় এলে বিচার মিলবে না। কী ভাবে লড়াই করতে হয় তা আমি জানি। আমার এই লড়াই বিচারের জন্য। এলাকার ভোটাররাও আমার পাশেই রয়েছেন।'

    অন্য দিকে, বিধায়ক-বাবা নাসিরউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুর পরে কর্পোরেট সংস্থার চাকরি ছেড়ে গত বছর এই কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে দাঁড়িয়ে জিতেছিলেন আলিফা আহমেদ। তমন্না খুনের পর থেকে দীর্ঘদিন কাটলেও আলিফা একবারও তমন্নাদের বাড়িতে বা সেই মোলান্দি গ্রামে যাননি বলে অভিযোগ। কিন্তু এ বার ভোটপ্রচারে তাঁকে সেখানে যেতে দেখা গিয়েছে। এ নিয়ে তমন্নার মায়ের বক্তব্য, 'এতদিন কি ভয়ে তিনি এই গ্রামে আসেননি? নাকি শোকগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সান্ত্বনা জানাতেও জানেন না?' আলিফার উত্তর, 'শিশুকন্যার এমন মৃত্যু খুবই দুঃখজনক ঘটনা। তবে বামপ্রার্থী সেই শোককে রাজনীতির মাঠে ব্যবহার করছেন।' বামেদের গুরুত্ব দিতে নারাজ আলিফা। তিনি বলেন, 'বাম–কংগ্রেস নয়, আসল লড়াইটা হবে বিজেপির সঙ্গে। গত বছর উপ–নির্বাচনে এক লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছিলাম। ৫০ হাজারে বেশি ভোটে হারিয়েছিলাম প্রতিপক্ষকে।'

    তবে, রাজনৈতিক মহল অন্য হিসেব কষছে। কালীগঞ্জ কেন্দ্রে ১৫,৬৫৮ জন ভোটার আন্ডার অ্যাজুডিকেশন বা 'বিচারাধীন' ছিলেন। তাঁদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষ এ বার ভোট দিতে পারবেন। নাম বাদ পড়েছে আরও প্রায় ২৪ হাজার ভোটারের। ফলে আগের বারের জয়ের মার্জিনের হিসেব এ বারে হেরফের হতে পারে। কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের জোট না হওয়ায় 'ভোট–কাটাকাটি'–এর অঙ্কটাও অন্য রকম হতে পারেই বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। গত উপ–নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বাম–কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন কংগ্রেসের কাবিলউদ্দিন শেখ। পেয়েছিলেন প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার ভোট। কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কর্মী ও এ বারের কংগ্রেস প্রার্থী কাবিল বলছেন, 'সিপিএম এ বার এখানে প্রার্থী দিয়েছে। তবু সিপিএম–তৃণমূলের বেশ কিছু ভোট আমার দিকে চলে আসবে। আমার লড়াই মূলত তৃণমূলের সঙ্গে।'

    এই বিধানসভা থেকে প্রথম বার ভোটের ময়দানে লড়ছেন বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষ। তিনিও প্রচারে বেরিয়ে কোনও খামতি রাখছেন না। এ নিয়ে বিজেপির নদিয়া উত্তর সাংগঠনিক জেলার মুখপাত্র সন্দীপ মজুমদার বলেন, 'সিপিএম, কংগ্রেস এখন এ রাজ্যে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনকে ব্যবহার করে গত উপ–নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল। এ বার ভোটের হাওয়া ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে।' তাঁর দাবি, এক বছরের ব্যবধানে কালীগঞ্জ এখন অন্যরকম।

  • Link to this news (এই সময়)