• রিল নয় রিয়েল হিরো! ৬৬-তেও স্বপ্নপূরণের পথে দীনেশ
    এই সময় | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • বাস্তব বিশ্বাস

    এই সময়: পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত ঠিক করে হাঁটতেও পারতেন না। তাই বন্ধুরা ব্যঙ্গ করে ‘ডান্ডা’ বলে ডাকত। সেই পাঁচ বছরের খুদেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সকলকে চমকে দেন। তখন তাঁর বয়স ৮৯ বছর। ততদিনে একের পর এক স্বজনের মৃত্যুর সাক্ষী থেকেছেন ফৌজা সিং। কিন্তু ৮৯–এ এসে দৌড় শুরু করলেন তিনি। দৌড়লেন একের পর এক ম্যারাথন। ২০০০ সালে ফৌজা লন্ডনে তাঁর প্রথম ম্যারাথন ৬ ঘণ্টা ৫৪ মিনিটে শেষ করেন। এর পর একে একে নিউ ইয়র্ক, মুম্বই, হংকং, গ্লাসগোর মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যারাথনে অংশ নেন। অর্জন করেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ‘ম্যারাথন ফিনিশার’-এর খেতাব। ফৌজা সিংয়ের গল্পটা হয়তো আপনাদের অনেকেরই জানা। কিন্তু দীনেশ মহন্ত ঠাকুদাসের গল্পটা জানেন কি? আমাদের চারপাশের চেনা জীবনের পরিচিত ছকের বাইরে গিয়ে এক অন্য রকম অনুপ্রেরণার গল্প লিখছেন আমেদাবাদের দীনেশ।

    বয়স ৬৫ পেরিয়ে ৬৬-তে পড়েছে। জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসে এসে তিনি সমাজকে দেখিয়ে দিলেন যে, মনের জোর থাকলে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে একটি বিমা কোম্পানিতে ক্লার্ক হিসেবে চাকরি করার পরে তিনি অবসর নেন। তঁার তিন সন্তান বর্তমানে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত, মাথার উপরে বিশাল কোনও আর্থিক দায়বদ্ধতাও নেই। সাধারণত এই বয়সে এসে মানুষ বাকি জীবন আরামে কাটাতেই পছন্দ করেন। কিন্তু দীনেশ হাঁটছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের দীর্ঘদিনের দেশ–বিদেশ ঘোরার স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে বেছে নিয়েছেন একটি ক্যুইক কমার্স সংস্থায় ডেলিভারি দেওয়ার কাজ।

    শুরুটা হয়েছিল নিতান্তই সাধারণ ভাবে। একদিন নিজের পাড়ায় এক ডেলিভারি বয়কে কাজ করতে দেখে প্রথমে তাঁর মনে কৌতূহল জেগেছিল। আর সেই কৌতূহল থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। রীতিমতো অবাক করা বিষয় হলো, এই বয়সেও তিনি উদ্যমের সঙ্গে গত দু’বছরে মোট ১০,২২০টিরও বেশি ডেলিভারি করেছেন। প্রতিদিন ভোর ৫টায় নিয়ম করে তাঁর দিন শুরু হয়, আর সকাল ৬টার মধ্যেই তিনি ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে পৌঁছে যান কোম্পানির স্থানীয় ‘ডার্ক স্টোর’-এ। তাঁর পছন্দের শিফট চলে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। তার পরে নিজের শরীর কেমন থাকে দেখে ঠিক করেন বাকি দিনটায় কাজ চালিয়ে যাবেন কি না। এই বয়সে তাঁর এই হাড়ভাঙা খাটুনির কারণ কিন্তু সংসারের দৈনন্দিন খরচ জোগানো নয়। উপার্জিত প্রতিটি টাকা তিনি জমিয়ে রাখেন শুধুমাত্র নিজের ভ্রমণের জন্য। নতুন নতুন শহর, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এমনকী বিদেশে ঘোরার যে স্বপ্ন তিনি দীর্ঘ দিন ধরে নিজের মনে লালন করে এসেছেন, আজ তা তিনি নিজের রোজগারের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করছেন। দীনেশের কথায়, ‘অভিজ্ঞতাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।’

    সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই অদম্য জেদ এবং পেশাদারিত্বের গল্পে নেটিজে়নদের প্রশংসার বন্যা বয়ে গিয়েছে। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই কুর্নিশ জানিয়েছেন। তবে এই বয়সে এতটা শারীরিক ধকল নেওয়াটা শরীরের জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েও বেশ কিছু মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই সব আলোচনা এবং সমালোচনাকে দূরে সরিয়ে দীনেশ প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, মনের জোর এবং ইচ্ছেশক্তি থাকলে বয়সের বাধাকে টপকে কোনও না কোনও ভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণ করা যায়।

    ফৌজা সিংয়ের লড়াইয়ের গল্প দীনেশ জানেন কি না, জানা নেই আমাদের। তবে ফৌজার সেই ‘ফৌজি’ লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেল আর এক ‘সিনিয়র সিটিজ়েন’— আশি বছরের ‘তরুণ’ বলদেব সিং বেইনস। ফৌজার অনুপ্রেরণাতেই ২৬ এপ্রিল জীবনের প্রথম লন্ডন ম্যারাথনে নামতে চলেছেন তিনি। ফৌজার স্মৃতিতে রেডব্রিজে যেখানে তিনি এক সময়ে দৌড়তেন, সেই পথেই তৈরি হচ্ছে ‘ফৌজা সিং ক্লাবহাউস’। ১ এপ্রিল ফৌজা সিংয়ের ১১৫তম জন্মদিনে এই ক্লাবহাউস তৈরির আইনি ছাড়পত্র মিলেছে। প্রায় ১০ লক্ষ পাউন্ড খরচে তৈরি হতে চলা এই ক্লাবহাউস নির্মাণের জন্যই অর্থ সংগ্রহ করতে ট্র্যাকে নামছেন বলদেব। পঞ্জাবের হোশিয়ারপুরের বলদেব এক সময়ে দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ব্রিটেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এই দৌড়ের জন্য বলদেব গত বছর ফৌজা সিংয়ের প্রাক্তন কোচ, ৬৬ বছরের হরমিন্দর সিংয়ের কাছে জোরকদমে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। হরমিন্দর নিজেও এই ক্লাবহাউসের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে আসন্ন লন্ডন ম্যারাথনে দৌড়চ্ছেন।

  • Link to this news (এই সময়)