• মোদীর তোপে যাদবপুর, পাল্টা জবাব তৃণমূলনেত্রীর, কী বলছেন ছাত্র-অধ্যাপকরা?
    এই সময় | ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: ভোটের ময়দানে হঠাৎই দড়ি টানাটানির কেন্দ্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের জনসভা থেকে তৃণমূল আমলে পশ্চিমবঙ্গের দুর্দশা বোঝাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টেনে এনেছেন যাদবপুরের প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, যাদবপুর এখন ‘দেশ বিরোধীদের আখড়া’। মোদীর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে সরব হয়েছেন যাদবপুরের পড়ুয়া, অধ্যাপকরাও।

    শুক্রবার বারুইপুরের জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গোটা বিশ্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সম্মানের সঙ্গে নেওয়া হতো৷ এই ক্যাম্পাসের ভিত্তিই ছিল জাতীয়তাবাদ৷ কিন্তু আজকের পরিস্থিতি দেখুন, ক্যাম্পাসের ভিতরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে৷ দেওয়ালে দেশবিরোধী স্লোগান লেখা হচ্ছে৷’ এর পরেই মোদীর দাবি, ‘পড়াশোনার বদলে সেখানে ছাত্রদের রাস্তায় আন্দোলন করতে বাধ্য করা হচ্ছে৷ ওখানে আমরা অরাজকতার বদলে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে চাই৷ হুমকির বদলে সহমর্মিতা চাই৷’ যাদবপুরের প্রসঙ্গে টেনে তৃণমূল সরকারকেও বিঁধেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যে সরকার নিজের রাজ্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী ভাবে রক্ষা করবে?’

    মোদীর যাদবপুর নিয়ে মন্তব্য করার পরেই প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া প্রতিক্রিয়া দেন মমতা। ওই পোস্টে তাঁর বক্তব্যের নির্যাস, ‘ছাত্ররা প্রতিবাদে সরব হওয়া মানে অরাজকতা নয়। যাদবপুরে ছাত্ররা মেধার ভিত্তিতে ডিগ্রি নিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। এটা অরাজকতা নয়। এ ভাবে আপনি বাংলাকে অপমান করতে পারেন না।’ পরে এ দিন বিকেলে হাওড়ার সভায় ফের মমতা টেনে আনেন মোদীর তোলা যাদবপুর প্রসঙ্গ। তৃণমূলনেত্রী আক্রমণ শাণিয়ে বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের গর্ব। আমাদের যুবক-যুবতীরা আমাদের গর্ব। যাদবপুর দেশের এক নম্বরে রয়েছে। কোনও টাকা আপনারা যাদবপুরকে দেন না। আর বলছেন ওখানে নাকি নৈরাজ্য চলছে।’ পড়ুয়াদের উদ্দেশে মমতার আহ্বান, ‘আমি মনে করি ছাত্র-যুবদের এর প্রতিবাদ করা উচিত।’

    যাদবপুরের সঙ্গে বিজেপি ও গেরুয়া শিবিরের দ্বৈরথ নতুন কিছু নয়। কখনও গেরুয়াপন্থী সিনেমা দেখানোকে ঘিরে যাদবপুর রণক্ষেত্র হয়েছে। কখনও রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করেও ছড়িয়েছে উত্তেজনা। র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় যখন যাদবপুরের ভিতরে পড়ুয়ারা প্রতিবাদরত, তখনও ক্যাম্পাসে ঢুকে অশান্তি করার অভিযোগ উঠেছে গেরুয়া শিবিরের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এনআরসি আন্দোলন থেকে ২০২১–এর ভোটের আগে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেনে সক্রিয় ভাবে মোদী ও বিজেপির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন যাদবপুরের পড়ুয়ারা। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় (এখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ)-কে দীর্ঘক্ষণ ঘেরাও করে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে সেখানকার একদল পড়ুয়ার বিরুদ্ধে। বাবুলকে ক্যাম্পাস থেকে বের করতে সেখানে যেতে হয় তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়কেও। এ দিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে বাবুল অবশ্য বলছেন, ‘আমার উপরে হামলা হয়েছিল। তখন তো আমি প্রধানমন্ত্রীর দলেরই সাংসদ ছিলাম। তখন তো তিনি একটাও কথা বলেননি, টুইট করেননি। এমনকী তাঁর দলের কোনও নেতা আমায় বাঁচাতে ছুটেও যাননি। আমার পাশে একমাত্র দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন রাজ্যপাল।’

    সাম্প্রতিক অতীতে যাদবপুরের দেওয়ালে ‘আজ়াদ কাশ্মীর’–এর দেওয়াল লিখন নিয়ে তীব্র বাদানুবাদ তৈরি হয় গেরুয়া ও বাম শিবিরের মধ্যে। পরে কর্তৃপক্ষ সেই দেওয়াল লিখন মুছে দেয়। মাওবাদী নেতাদের নামে নানা দেওয়াল লিখন নিয়েও বাম ও গেরুয়া শিবিরের পড়ুয়াদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও সমান ভাবে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন যাদবপুরের পড়ুয়ারা। ‘হোক কলরব’ আন্দোলন থেকে শুরু করে গত বছর ক্যাম্পাসে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর একটি অনুষ্ঠান ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও এ দিন যাদবপুরের পড়ুয়া, প্রাক্তনী এবং অধ্যাপকদের একটা বড় অংশই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়ের কথায়, ‘যাঁরা দেশের সম্পদ ও সম্পত্তি বেচে দিয়ে জনবিরোধী কার্যকলাপ করে, তাঁরা যখন আমাদের দেশ–বিরোধী বলেন, তখন বুঝতে পারি আমরা দেশের হিতেই কাজ করছি।’ শিক্ষক সমিতি জুটার বিবৃতি, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আজ উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে দেশ-বিদেশে স্বীকৃত। শিক্ষা,গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়ের লড়াইয়েও বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে ইনস্টিটিউট অফ এমিনেন্স-এর যাবতীয় শর্ত পূরণ করে যোগ্যতা অর্জন করেও এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রতিশ্রুত রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযানের টাকাও পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ইউজিসি তুলে দেওয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’

    তাই অহেতুক বিতর্ক না বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের দিকেই নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপকরা।

  • Link to this news (এই সময়)