প্রশান্ত ঘোষ, রাজারহাট–নিউ টাউন
শহরের চমক বনাম গ্রামের উন্নয়ন ইস্যুই বড় ফ্যাক্টর ‘নতুন কলকাতা’র। রাজারহাট–নিউ টাউন বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষত্বই হলো এলাকার দ্বৈত চরিত্র। একদিকে গ্রামীণ পঞ্চায়েত এলাকা, অন্যদিকে আধুনিক শহুরে নিউ টাউন ও পুরসভা অঞ্চল। স্বাভাবিক ভাবেই ভোটের ইস্যু এখানে একমুখী নয়, বরং বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। তাই এলাকা অনুযায়ী প্রচারের হাতিয়ারও ভিন্ন।
রাজারহাট পঞ্চায়েত সমিতির অধীনে পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত, বিধাননগর পুরসভার ১১টি ওয়ার্ড এবং এনকেডিএ এলাকার ১০টি বুথ নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা কেন্দ্র। গ্রামীণ এলাকায় কৃষি, মৎস্যচাষ, নার্সারি, রাস্তা ও নিকাশি প্রধান সমস্যা হলেও শহুরে অংশে নাগরিক পরিষেবা, ট্র্যাফিক, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই প্রার্থীরা আলাদা আলাদা কৌশলে প্রচার চালাচ্ছেন।
তৃণমূল প্রার্থী ও বিদায়ী বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায় নিজের কাজের উপরই ভরসা রাখছেন। দীর্ঘদিন পুর প্রশাসন এবং বিধানসভায় থাকার সুবাদে নারায়ণপুর-গোপালপুর অঞ্চলে তাঁর সংগঠন ও প্রভাব এখনও যথেষ্ট। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক কাজ, এই ইমেজকেই সামনে রাখছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এলাকার মানুষ তাঁর কাজ সম্পর্কে অবগত, আলাদা করে প্রচারের প্রয়োজন নেই।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, তাপসের উন্নয়ন নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ। বিজেপি প্রার্থী সরাসরি দাবি করেছেন, বিধায়ক নারায়ণপুরের বাইরে সক্রিয় নন। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে তাপস চট্টোপাধ্যায় একাধিক প্রকল্পের উল্লেখ করেছেন, যা বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এমনকি বিধায়কের সাম্মানিক ভাতাও মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি তাপসের।
এক সময়ে বামেদের খাস তালুক ছিল রাজারহাট। এই এলাকার নেতা প্রাক্তন আবাসন মন্ত্রী গৌতম দেবের হাত ধরেই রাজারহাট নিউ টাউনের সূচনা। সেই নিউ টাউনের বাসিন্দা গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষি দেব এ বার এই কেন্দ্রের বাম প্রার্থী। যেহেতু বিধানসভাটি শহর এবং গ্রামীণ মিলিয়ে, তাই প্রচারের ইস্যুগুলো আলাদা করে তিনটে ভাগে ভাগ করেছেন সপ্তর্ষি। পুরসভার ওয়ার্ড, পাঁচটি পঞ্চায়েত এবং এনকেডিএ এরিয়ার জন্য আলাদা আলাদা সমস্যা এবং প্রতিশ্রুতির কথা বলছেন তিনি। সপ্তর্ষির বক্তব্য, ‘নিউ টাউনকে ঝাঁ চকচকে করা হলেও সংলগ্ন এলাকার উন্নয়ন হয়নি। হিডকো ৮০০ কোটি টাকা খরচ করে দুটো মন্দির করছে। অথচ নিউ টাউনের সংযুক্ত এলাকায় কোনও উন্নয়ন করেনি। নিউ টাউনের অটো ও টোটোর ভাড়া ঠিক করে নির্ধারণ করা হয়নি। শিখরপুরের রুপোশিল্পের পাশে দাঁড়ায়নি সরকার। শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য আছে।’
অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী পীযূষ কানোরিয়া সরাসরি শাসক ও বাম দু’পক্ষকেই আক্রমণ করছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘দীর্ঘদিন ধরেই রাজারহাটে কোনও পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা ও নিকাশির সমস্যা প্রবল, অন্যদিকে শহুরে এলাকায় বেআইনি নির্মাণ ও জলাভূমি ভরাট পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।’ পীযূষের দাবি, ক্ষমতায় এলে সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ করা, অবৈধ প্রোমোটিং রোখা এবং গ্রাম-শহরের মধ্যে উন্নয়নের ভারসাম্য আনা হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, এই কেন্দ্রে ২০২১ সালে তাপস চট্টোপাধ্যায় প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি বিজেপির থেকে ৫৬ হাজার ভোট বেশি পেয়েছিলেন। বিজেপি প্রার্থী ভাস্কর রায় পেয়েছিলেন ৭১ হাজার ভোট। আর বাম প্রার্থী সপ্তর্ষি পেয়েছিলেন সাড়ে ৩১ হাজার ভোট।
সব মিলিয়ে রাজারহাট–নিউটাউন কেন্দ্রে লড়াই কার্যত ত্রিমুখী। শাসকদল উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং সংগঠনের জোরে মসনদ ধরে রাখতে চাইছে। আর বাম ও গেরুয়া শিবির বৈষম্যের ইস্যু তুলে নতুন করে জমি খোঁজার চেষ্টা করছেন। শহর ও গ্রামের আলাদা আলাদা ইস্যু—এই কেন্দ্রের ভোটের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। কোন ইস্যু কতটা প্রভাব ফেলবে, আর শেষ পর্যন্ত কোন শিবির সেই ভারসাম্যটা ধরে রাখতে পারবে—সব উত্তর পাওয়া যাবে ৪ মে।