সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
ভাঙা পায়ে জড়ানো ক্রেপ ব্যান্ডেজ। অন্য পায়ের ভরেই কোনওরকমে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে চলেছেন এক বৃদ্ধ। সাইকেলের সামনে বাঁধা কংগ্রেসের ইস্তেহার। এই দৃশ্য এখন কালনার সিমলনের বাসিন্দাদের কাছে যেমন পরিচিত, তেমনই এ বার কিছুটা বিস্ময়েরও। কারণ, পা ভাঙা অবস্থাতেই প্রচারে নেমেছেন প্রবীণ কংগ্রেস কর্মী প্রভাত দাস।
বছর ৭৫–এর অকৃতদার প্রভাত দাস বরাবরই একলা চলার মানুষ। তাঁর ফোনের কলার টিউনেও বাজে— ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ সেই বিশ্বাস নিয়েই বছরের পর বছর সাইকেলে চড়ে কংগ্রেসের সমর্থনে প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। তবে এ বারের দৃশ্যটা আলাদা। ভাঙা পা নিয়েই গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো দেখে অবাক হচ্ছেন অনেকেই।
প্রভাতের কথায়, ‘প্রচারের আর হাতে গোনা ক’টা দিন রয়েছে। কর্মী তেমন নেই, তাই প্রচারে আমরা কিছুটা দুর্বল। মানুষের কাছে কংগ্রেসের ইস্তেহার পৌঁছে দিতে ঘরে বসে থাকতে পারলাম না।’
মানুষের সমস্যায় সব সময়েই এগিয়ে আসেন তিনি। কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের দোরগোড়ায় পৌঁছনো হোক বা এলাকার সমস্যা তুলে ধরা— সবেতেই সক্রিয় প্রভাত। এমনই এক ঘটনায় গুপ্তিপুরের কাছে একটি ভাগাড়ের সামনে রাস্তায় পশুর দেহ পড়ে থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে গিয়েই দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি। গত ৯ ফেব্রুয়ারি সিমলনের কাছে একটি মোটরবাইক তাঁর সাইকেলে ধাক্কা মারলে ডান পা ভেঙে গুরুতর জখম হন। অস্ত্রোপচারের পরে পায়ে প্লেট বসানো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি ছিলেন তিনি।
কিন্তু বিশ্রাম তাঁর স্বভাবে নেই। শুক্রবার ক্রেপ ব্যান্ডেজ বেঁধেই আবার বেরিয়ে পড়েন প্রচারে। সাইকেলে চড়ে মধুপুর, মছলন্দপুর, শাঁখাটি–সহ একাধিক এলাকায় ঘুরে বেড়ান, সামনে ঝোলানো ইস্তেহারের প্ল্যাকার্ড নিয়ে।
এমন দৃশ্য অবশ্য নতুন নয়। গত বছরও প্রায় দু’মাস ধরে সাইকেলে বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি। এমনকি নাগাল্যান্ডে রাহুল গান্ধীর ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-তেও যোগ দিতে কালনা থেকে সাইকেল চালিয়েই পৌঁছেছিলেন।
বর্তমানে ভাইপোদের সঙ্গেই থাকেন প্রভাত। তাঁর এক ভাইপো তিয়াস দাস বলেন, ‘চিকিৎসক তিন মাস বিশ্রাম নিতে বলেছেন। আমরা অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু উনি বললেন মানুষের কাছে পৌঁছতেই হবে।’
কালনার কংগ্রেস নেতারাও প্রভাতের এই অদম্য মনোভাবের প্রশংসা করেছেন। প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সদস্য মনোজ সাহা এবং জেলা কংগ্রেসের প্রাক্তন কার্যকরী সভাপতি বুলবুল আহমেদ শেখ বলেন, ‘এই ধরনের কর্মীরাই দলের আসল সম্পদ। এমন মানুষদেরই টিকিট পাওয়া উচিত ছিল।’
তবে শারীরিক কষ্ট যে নেই, তা নয়। প্রভাত নিজেই জানান, এক পায়ে সাইকেল চালাতে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা হয়েছে। তবে সমস্যা না–হলে শনিবারও এ ভাবেই প্রচারে বেরোব।’
ফল কী হবে, তা নিয়ে তাঁর ভাবনা নেই। তাঁর লক্ষ্য একটাই— মানুষের কাছে পৌঁছনো, নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা।